নিজস্ব প্রতিবেদন :
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিস দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, ঘুষ, দালালচক্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তথ্য বলছে, দলিল নিবন্ধন, তল্লাশি ও নকল উত্তোলন—প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রে সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয়রা বিষয়টিকে ওপেন সিক্রেট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সূত্র জানায়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হলেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি দমনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সরকারি কঠোর নির্দেশনা ও সতর্কতাও তেমন প্রভাব ফেলছে না।
পেশকার শেখ বিল্লাল:
তিন কোটি টাকার ডুপ্লেক্স বাড়ি, সরকারি বেতন ২২ হাজার,আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আলফাডাঙ্গা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের পেশকার শেখ বিল্লাল। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩২ হলেও অভিযোগ অনুযায়ী তিনি ৪৫ বছর বয়সে চাকরিতে যোগ দেন। গ্রেড–১৬ এর পেশকার পদে তার বেতন কাঠামো ৯,৩০০ থেকে ২২,৪৯০ টাকা—কিন্তু আয়–ব্যয়ের হিসাব ভিন্ন। ফরিদপুরের বিলমামুদপুর নতুনডাঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে তার তিন কোটি টাকার ডুপ্লেক্স বাড়ি ‘কোহিনুর মঞ্জিল’। সূত্র জানায়, শুধু নিজের জমি নয়, সরকারি দুই কাঠা জমিও দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ: “৪% ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল হয় না” দলিল লেখক, সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে একই চিত্র। অনেকেই বলেন—৪% ঘুষ ছাড়া জমির দলিল হয় না। সব নিয়ন্ত্রণ করেন পেশকার শেখ বিল্লাল। দলিল লেখকরা বলেন— অফিসে কাজ করতে হলে বিল্লালের অনুমতি লাগে। তার নিয়মের বাইরে কেউ গেলে ফাইল আটকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, রাতেও টাকা নিয়ে দলিল নিবন্ধন করা হয়, আর টাকা না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় মানুষকে।
শিক্ষা, চাকরি ও প্রভাব:
পেশকার মানেই আলাউদ্দিনের চেরাগ, স্থানীয়দের ভাষ্য, শেখ বিল্লাল বিলমামুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ময়েজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। আর্থিক সংকটে পড়াশোনা বন্ধ হলেও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি অফিস পিয়নের চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং দ্রুত পেশকারে উন্নীত হন। একজন বুয়েট-শিক্ষিত প্রকৌশলীর মতো প্রভাব নয়—বরং পেশকার মানেই আলাউদ্দিনের চেরাগ—এমন মন্তব্য এখন এলাকায় আড্ডার বিষয়।
দুদকে লিখিত অভিযোগ: অতিরিক্ত টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না
ফরিদপুর দুদক কার্যালয়ে নাজহিয়ান ইমন নামে একজন ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে সূত্র জানায় । অভিযোগে বলা হয়েছে—দলিল নিবন্ধন, নকল উত্তোলন—যেকোনো কাজে সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে ফাইল স্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হয় না।
অভিযোগ উঠেছে, শেখ বিল্লাল অফিসে একটি ‘অঘোষিত রেটকার্ড’ চালু করেছেন। কারো কাছে ১০ হাজার, কারো কাছে ৫০ হাজার—কাজের ধরন ও জমির মূল্যের ওপর নির্ভর করে অনৈতিক লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
ভুক্তভোগীদের ভয়: “বাধ্য হয়ে টাকা দেই, না হলে হয়রানি,সেবা নিতে আসা অনেকেই জানান—কথা বললেই রেগে যান। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখেন। অন্যজন বলেন—একটা দলিল করতে ৩ দিনের কাজ ১৫ দিন লাগে, যদি না দেই অতিরিক্ত টাকা।
অভিযোগ অস্বীকার করে বিল্লাল: ঘুষ নয়, সরকারি ফি নিচ্ছি, শেখ বিল্লাল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন—এসব মিথ্যা। ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি করেছি। তিনি দাবি করেন, একটি ব্যাংক থেকে ৮৪ লাখ টাকার ঋণ পেয়েছেন। তবে ২৫ হাজার টাকার বেতনে এত বড় ঋণ কীভাবে সম্ভব—প্রশ্ন উঠেছে, তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দেননি। সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন— নিউজ হলে আমার কিছু যায় আসে না। সাময়িক একটু ঝামেলা হবে, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।
অভিযোগ:
সাংবাদিকদেরও মাসোহারা, স্থানীয় সূত্র জানায়, কিছু সাংবাদিককে মাসোহারা দিয়ে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতেন বিল্লাল। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য— কেউ তার বিরুদ্ধে লিখতে আসে না। সব ম্যানেজ করে রেখেছেন।
দুদকের বক্তব্য:
তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে,দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান—আলফাডাঙ্গা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অভিযোগ তদন্তাধীন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় দাবি করেন
কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতি আরও বাড়বে, আলফাডাঙ্গা এলাকায় দলিল করতে গেলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপ ছাড়া দুর্নীতি রোধ করা যাবে না। আইনজীবীরা বলছেন— দেশজুড়ে সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলো দুর্নীতি ও দালালচক্রের হটস্পট। আলফাডাঙ্গার ঘটনা কেবল বরফখণ্ডের দৃশ্যমান অংশ।
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিলাসবহুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। তথ্য বলছে, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং হিসাববহির্ভূত সম্পদ অর্জনের নেপথ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয়।
দুদকের প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং স্থানীয় নাগরিক সমাজের চাপ ছাড়া দুর্নীতি থামবে না—এমনটাই বলছেন আইনজীবী ও ভুক্তভোগীরা।