অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 10, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জোকা বিল মৎস্য প্রকল্পে দুর্নীতির জাল, ৬২ লাখ টাকার আত্মসাতের অভিযোগে

জোকা বিল মৎস্য প্রকল্পে দুর্নীতির জাল, ৬২ লাখ টাকার আত্মসাতের অভিযোগে উত্তপ্ত বাগমারা


 রাজশাহী প্রতিনিধি  

রাজশাহীর বাগমারার নরদাশ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী জোকা বিল— যে বিল একসময় স্থানীয় কৃষকদের জন্য ছিল সেচ সুবিধা আর মাছচাষের সম্ভাবনার প্রতীক, আজ তা ঘিরে তৈরি হয়েছে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র।

অভিযোগ উঠেছে, এই বিলকেন্দ্রিক “জোকা বিল মৎস্যচাষ প্রকল্পে” দীর্ঘদিন ধরে চলেছে অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও ক্ষমতার দখলযুদ্ধ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে গিয়েই এবার নিজেই অভিযুক্ত হয়েছেন হিসাবরক্ষক সাজ্জাদুর রহমান মিঠু। প্রকল্পের প্রায় ৬২ লাখ টাকার আত্মসাতের অভিযোগে তাকে কমিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিলে জড়ো হচ্ছে দুই পক্ষের লোকজন— আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। প্রশ্ন উঠছে, এই বিল কে বা কারা আসলে নিয়ন্ত্রণ করছে?
তথ্য বলছে, এটি শুধু একটি মৎস্যচাষ প্রকল্প নয়; বরং একটি বহুমাত্রিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আর্থিক ক্ষেত্র, যেখানে প্রতি মৌসুমে লেনদেন হয় কোটি টাকার।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২০০৬ সাল থেকে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি করে বিলটিতে শুরু হয় মাছচাষ কার্যক্রম। প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের প্রতি বিঘা জমির জন্য বছরে ৬ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং বিনামূল্যে সেচ সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, আমরা ভেবেছিলাম মাছচাষে বিলের উন্নয়ন হবে। সেচের মাধ্যমে ধানও হবে, মাছও হবে— সবাই উপকৃত হবো। কিন্তু এখন শুনছি লাখ লাখ টাকা ভাগ হয়ে গেছে কারো পকেটে।”

তথ্য বলছে, গত ১৮ বছরে বিলটি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ও মৎস্য বিক্রির টাকা কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই টাকা মূলত স্থানীয় কৃষক, অংশীদার ও কমিটির সদস্যদের মধ্যে বণ্টনের কথা ছিল।

কিন্তু সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের হিসাব কখনও নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বরং এক ধরনের “অঘোষিত গোপন আর্থিক কাঠামো” তৈরি করে কিছু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এই অর্থ প্রবাহ।

প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, এলাকায় প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী ‘জোকা বিল মৎস্যচাষ প্রকল্প’ নামে একটি নতুন কমিটি গঠন করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই কমিটি গঠনের সময় কোনো নির্বাচন, সর্বসম্মতি বা আইনি অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

নতুন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান এফাজুর রহমান এবং সহ-সভাপতি পদে আসেন কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী। আর হিসাবরক্ষক পদে নিযুক্ত হন সাজ্জাদুর রহমান মিঠু।

তথ্য বলছে, ঠিক এই সময় থেকেই শুরু হয় প্রকল্পের তহবিল নিয়ে টানাপোড়েন।

কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম জানান, হিসাবরক্ষক সাজ্জাদুর রহমান মিঠু ও ক্যাশিয়ার আফসার আলী আমার ও কয়েকজন সদস্যের স্বাক্ষর জাল করে প্রকল্পের টাকা তুলে নেয়। পরে দেখা যায়, একাধিক ভুয়া ভাউচার তৈরি করে তিন লাখ ৫২ হাজার টাকা, মাছ বিক্রির টাকা ৩০ লাখ টাকার বেশি, আর নানা অনিয়মে আরও ২৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকার মতো হেরফের করেছে। মোট ৬২ লাখ ৭ হাজার টাকার হিসাবই মেলানো যাচ্ছে না। 

তিনি আরও দাবি করেন,

“এই টাকা আত্মসাতের প্রমাণ গোপন করার জন্য তারা আয়ের দুটি ভাউচার বইই গায়েব করে দিয়েছে।”

এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি এফাজুর রহমান বলেন,

“মিঠু প্রথমে আমাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল, হিসাবের খাতা ও ব্যাংক লেনদেনের অনেক জায়গায় অসঙ্গতি। তদন্তে প্রাথমিকভাবে তার সংশ্লিষ্টতা ধরা পড়ে। তাই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। 

অন্যদিকে অভিযুক্ত হিসাবরক্ষক সাজ্জাদুর রহমান মিঠু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,

“আমি দুর্নীতি ধরতে গিয়ে নিজেই চক্রান্তের শিকার হয়েছি। কমিটির সহ-সভাপতিসহ কয়েকজন বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছে। আমি সেটির প্রমাণ দিতে গেলে তারা আমার বিরুদ্ধে উল্টো মামলা সাজিয়েছে।”

তার দাবি, সব অর্থ লেনদেন হয়েছে সভাপতি ও সহ-সভাপতির নির্দেশে, এবং তিনি শুধু হিসাব রাখার দায়িত্বে ছিলেন।

প্রশ্ন উঠছে — এই বিপুল অঙ্কের টাকা আসলে কারা তুলেছে?
তথ্য বলছে, প্রকল্পের ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ ছিল মাত্র ৩ জনের হাতে, আর স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগও উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে তুলছে।

শুধু অর্থ নয়, এই বিলকে কেন্দ্র করে এলাকায় দুটি হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে গত কয়েক মাসে। স্থানীয় থানার একটি সূত্র জানায়, এ ঘটনাগুলোর পেছনেও প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ইস্যু ছিল।

একজন স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা বলেন,

“জোকা বিল এখন আর কৃষকের বিল না। এটা এখন টাকার বিল। যার হাতে ক্ষমতা, তার হাতে বিল।”

এলাকায় বর্তমানে দুইটি পক্ষ বিলের দখল ও আয় বণ্টন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এরই মধ্যে আবারও সংঘর্ষ ও রক্তপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

প্রাপ্ত নথি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী— বিষয় পরিমাণ (প্রায়)
মাছ বিক্রির মোট আয় (গত মৌসুম) ৯২ লাখ টাকা,কৃষক প্রদত্ত সেচ ফি ১১ লাখ টাকা,
ব্যয়ের হিসেবে দেখানো ৩১ লাখ টাকা,অজানা বা যাচাইযোগ্য নয় ৬২ লাখ ৭ হাজার টাকা,

প্রশ্ন উঠছে — এত বড় অঙ্কের টাকা কোথায় গেল? কেন সঠিক নিরীক্ষা বা সরকারি তদারকি ছিল না?

খাদ্য ও মৎস্য অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জোকা বিল মৎস্যচাষ প্রকল্প স্থানীয়ভাবে গঠিত হলেও এর সব কার্যক্রমের ওপর জেলা প্রশাসনের তদারকি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা নেই। এখানেই সুযোগ নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট।”

মৎস্য আইনে (বাংলাদেশ মৎস্য সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ ও সংশোধিত ধারা অনুযায়ী) এ ধরনের প্রকল্পে আর্থিক স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা ও আয় বণ্টনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে গঠিত প্রকল্পগুলো অনেক সময় “অঘোষিতভাবে” পরিচালিত হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ থাকে না কারও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এই শূন্যতা থেকেই জন্ম নেয় দুর্নীতির উপযুক্ত পরিবেশ। 

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সির সাবেক উপদেষ্টা ড. রফিকুল ইসলাম বলেন,

“যখন কোনো অর্থনৈতিক কার্যক্রম হয় স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে, অথচ সেটির ওপর সরকারি বা তৃতীয় পক্ষীয় নিরীক্ষা নেই — তখন স্বাভাবিকভাবে দুর্নীতি গজিয়ে ওঠে। জোকা বিলের ঘটনাটি এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ। 

তিনি আরও বলেন,

“৬২ লাখ টাকা হয়তো টাকার অঙ্কে বিশাল না মনে হতে পারে, কিন্তু স্থানীয় অর্থনীতির জন্য এটি অনেক বড় একটি অঙ্ক। এটি স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবীদের অধিকার খেয়ে ফেলা একটি দুর্নীতির চক্র। 

স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, মাছচাষ প্রকল্পের নামে তাদের জমি ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থ অনেক সময় তারা পান না।

কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন,

“তিন বছর ধরে আমরা বিঘাপ্রতি টাকা পাইনি। অথচ মাছ বিক্রি হচ্ছে। কার পকেটে টাকা যাচ্ছে আমরা জানিও না।”

আরেক কৃষক নার্গিস বেগম বলেন, ওরা সব বড় বড় লোক। সাধারণ কৃষকের মুখ বন্ধ করে দেয়। হিসাব কেউ দেয় না।”

 প্রশ্ন উঠছে, কে বা কারা জোকা বিল প্রকল্পের আর্থিক হিসাব নিয়ন্ত্রণ করছে? কেন নিয়মিত নিরীক্ষা ও সরকারি তদারকি নেই? ৬২ লাখ টাকার আত্মসাৎ প্রমাণে কার বক্তব্য সত্য—কমিটির নাকি হিসাবরক্ষকের? এই ঘটনার পেছনে কি রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ভূমিকা রয়েছে?স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ন্যায্য পাওনা আদৌ তারা পাচ্ছেন কি না?

স্থানীয়ভাবে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে স্বচ্ছ তদন্তের আবেদন জমা পড়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন,

“এটা এখন শুধু কমিটির অভ্যন্তরীণ বিষয় না। এখানে সরকারি তহবিল, কৃষকদের অর্থ আর জনস্বার্থ জড়িত। দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত।”

 দুর্নীতির জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি কোথায়? জোকা বিল একসময় ছিল কৃষকের ভরসা। আজ সেটি পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, প্রভাব ও ক্ষমতার আঁতুড়ঘরে।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে অভিযোগকারীই যখন অভিযুক্ত হয়ে পড়ে, তখন স্থানীয় জনমনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়— “দায়মুক্তির সংস্কৃতি, দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট— এই তিন বিষয়ের সংমিশ্রণেই জন্ম নেয় এমন দুর্নীতির নাটক।”

সরকার যদি এখনই স্বচ্ছ তদন্ত ও আর্থিক নিরীক্ষা না করে, তাহলে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের আস্থা হারিয়ে এই বিল আরও বড় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে — এমন আশঙ্কা স্থানীয়দের।

 তথ্য বলছে, প্রকল্পের আর্থিক হিসাব বছরের পর বছর অডিট হয়নি। কৃষকদের পাওনা পরিশোধে অনিয়ম ছিল নিয়মিত।
প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করছিল বিল।

 সূত্র জানায়, প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল বর্তমান কমিটি।রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় ছিল এ সিন্ডিকেট।

 প্রশ্ন উঠছে, দুর্নীতির দায়ে শুধু মিঠু নাকি আরও অনেকে জড়িত?
কেন বিলের আর্থিক খতিয়ান প্রকাশ করা হয়নি এত বছর?


জোকা বিলের মাছচাষের জালে এখন মাছের চেয়ে দুর্নীতির গন্ধই বেশি।
এই গন্ধ কেবল স্থানীয় নয়— এটি বাংলাদেশের অনেক স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের মতোই তদারকি শূন্যতার এক উন্মুক্ত জানালা।
প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই দুর্নীতির জলাবদ্ধতা কাটার সম্ভাবনা নেই— এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সফুরা বেগম রুমী গ্রেপ্তার

1

আয়ের উৎস নেই, তবু ৫ তলা বাড়ি: ওয়াসা গাড়ি চালক তাজুল ইসলাম

2

আমাদের জীবিত কিংবদন্তি দিলারা জামান...

3

ডিপ ফ্রিজে ফাইল, এই বরফ কবে গলবে?

4

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিনর সিইও’র সাক্ষাৎ

5

সাবেক আইনমন্ত্রীর পিএস ১১৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ।

6

গাজীপুরে নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেলেন জনাব মোঃ আজাদ

7

আদালতের নির্দেশে এস আলম গ্রুপের ১,৯৩৬ একর জমি জব্দ,

8

জয়পুরহাটে জামায়াতের সদস্য সম্মেলন : পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের

9

অক্সিজেন সিলিন্ডারের মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ না থাকায় চুয়াডাঙ্গা

10

রাশিয়ার ড্রোন হামলায় ইউক্রেনে নিহত ১

11

হিউম্যান এইড কক্সবাজার জেলা শাখা অনুমোদন

12

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা

13

চলতি সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম না কমলে আমদানি : বাণিজ্য উপদেষ্টা

14

জনগণের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত: অর্থমন্ত্রী

15

রোহিঙ্গা সংকটে ইউনূস-অ্যান্ড্রুজ বৈঠক

16

অপরাধীদের কোন ছাড় দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

17

এসএসসি-পরীক্ষায়-ফিরলো-‘সাইলেন্ট-এক্সপেল’,-এটি-কীভাবে-করা-হয়

18

গাজীপুরে আবাসিক হোটেল অভিযানে আটক ১৩

19

টাঙ্গাইল শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে ৭ দিনের কর্মসূচি শুরু

20