হেলাল শেখ
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে ‘ছোট পাইপ বিতর্ক: জলাবদ্ধতা নিরসনে দায়সারা কাজের অভিযোগ, প্রশ্নে প্রকল্প তদারকি
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ঘিরে নতুন করে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠছে। উড়াল সড়কের নিচ দিয়ে ছোট আকারের পাইপ স্থাপনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা নিরসনের কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে অস্থায়ী সমাধানের নামে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগও তুলছেন স্থানীয়রা। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
শনিবার (৯ মে ২০২৬) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচ দিয়ে কয়েকটি ছোট আকারের পাইপ বসানো হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে এলাকাবাসী, শ্রমিক সংগঠন ও ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এর পরপরই সংশ্লিষ্টরা দ্রুততার সঙ্গে কিছু ছোট পাইপ বড় ড্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত করেন।
তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, যেভাবে পাইপ স্থাপন করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং এতে সাময়িকভাবে পানি নামলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী বড় আকারের ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে সংকীর্ণ পাইপ বসিয়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই আশুলিয়া ও সংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়তে শুরু করে। আগে যেখানে ভারী বৃষ্টির পানি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেমে যেত, এখন সেখানে দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। এতে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকার এক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, “আমরা বারবার বড় ড্রেন বা স্থায়ী পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা চেয়েছি। কিন্তু এখন যে ছোট পাইপ বসানো হচ্ছে, তা দিয়ে সামান্য বৃষ্টির পানি নামলেও ভারী বর্ষণে পুরো এলাকা ডুবে যাবে।”
আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, “প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের ভোগান্তি বেড়েছে। রাস্তা কাটা, মাটি ভরাট আর ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। এখন আবার ছোট পাইপ বসিয়ে বলা হচ্ছে সমস্যার সমাধান হবে। এতে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ তৈরি হতে পারে।”
তথ্য বলছে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প রাজধানীর সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ উন্নত করার অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ঘিরে শুরু থেকেই ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণমান, ক্ষতিপূরণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্বাভাবিক খাল ও ড্রেনেজ লাইন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি এলাকাবাসীর আন্দোলনের পর আপাতত কিছু পাইপ বড় ড্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হলেও নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগে এগুলোর মুখ আবার বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের অস্থায়ী ব্যবস্থা মূল সমস্যার সমাধান করবে না।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে কেন স্থায়ী ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখা হলো না। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, নিম্নমানের অবকাঠামো নির্মাণ ও ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে ছোট পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় কয়েকজন শ্রমিক নেতা দাবি করেন, তারা বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এলাকার পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে।
একজন শ্রমিক সংগঠনের নেতা বলেন, “মানববন্ধন না করলে হয়তো এই পাইপও বসানো হতো না। কিন্তু এখন যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও যথেষ্ট নয়। আমরা স্থায়ী সমাধান চাই।”
প্রশ্ন উঠছে, এত বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ড্রেনেজ পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, যেকোনো এলিভেটেড সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উড়াল সড়কের পিলার, মাটি ভরাট ও সংযোগ সড়ক স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
একজন নগর বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ঢাকার আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা এখন বড় নগর সংকটে পরিণত হয়েছে। সেখানে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ড্রেনেজ ব্যবস্থা যথাযথভাবে পরিকল্পনা না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু ছোট পাইপ বসিয়ে সাময়িক পানি সরানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কার্যকর হবে না। বরং ভবিষ্যতে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।”
অভিযোগ উঠছে, প্রকল্প ঘিরে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্থায়ী অবকাঠামোর পরিবর্তে কম ব্যয় দেখিয়ে নিম্নমানের কাজ করা হলে এতে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ থাকে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
এ বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। ফলে স্থানীয়দের অভিযোগ ও আশঙ্কার বিষয়ে সরকারি অবস্থান স্পষ্ট হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বড় সড়ক ও উড়াল সড়ক নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি উপেক্ষিত হলে এর প্রভাব স্থানীয় জনগণের ওপর দীর্ঘমেয়াদে পড়ে।
তারা মনে করছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় জনগণের মতামত, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় উন্নয়ন প্রকল্পই নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা হলে আশুলিয়া ও আশপাশের এলাকা ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে। তাদের ভাষ্য, অতীতে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ও বসতবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়লেও তাদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব পায় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর দেখা দেয় নতুন নতুন সমস্যা।
তথ্য বলছে, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে বিভিন্ন সংস্থা হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক এলাকাতেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কিছু এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও সংকুচিত হয়েছে বলে নগর বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ।
এই পরিস্থিতিতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে ছোট পাইপ স্থাপনের ঘটনা নতুন করে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে—বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও তদারকি কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।