নিজস্ব প্রতিবেদন
বহু প্রকল্পে ঘুষ-বাণিজ্য, অডিট জালিয়াতি ও ভুয়া বিল
কর্মজীবনের প্রতিটি বড় প্রকল্পেই অনিয়মের ছাপ রেখে গেলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আব্দুল রেজ্জাক
তথ্য বলছে — প্রশিক্ষণ থেকে যন্ত্রপাতি ক্রয়, সর্বত্রই দুর্নীতির ছাপ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের দীর্ঘ কর্মজীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক প্রকল্প পরিচালক আব্দুল রেজ্জাক। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, তাঁর দায়িত্বে থাকা প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেই অনিয়ম, ভুয়া বিল, অতিমূল্য প্রদর্শন, ঘুষ-বাণিজ্য ও অডিট জালিয়াতির ছাপ রয়ে গেছে।
২০২৩–২৪–২৫ অর্থবছরে শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্প”-এ প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসার পর, পুরোনো প্রকল্পগুলোর অনিয়মও ফের আলোচনায় আসে। তদন্তে দেখা যায়, রেজ্জাকের কর্মকৌশল ছিল এক — প্রকল্প বদলালেও দুর্নীতির ধরন একই থেকে গেছে।
প্রকল্পভিত্তিক অনিয়মের পূর্ণচিত্র
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্প (২০২২–২০২৫) মোট বাজেট: আনুমানিক ১৮–২০ কোটি টাকা
অভিযোগ প্রশিক্ষণার্থী তালিকার অর্ধেকই ভুয়া, একই ব্যাচকে একাধিকবার দেখানো
পুরোনো কম্পিউটার নতুন হিসেবে বিল, কোর্স সামগ্রী অতিমূল্যে ক্রয়, TA/DA খাতে ভুয়া সফর, অডিট টিমকে ঘুষ দিয়ে রিপোর্ট ‘পাস,সূত্র জানায়, এই প্রকল্পই ছিল রেজ্জাকের সবচেয়ে বড় দুর্নীতির মঞ্চ।
ইউনিয়ন পর্যায়ে যুব প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প, মোট বাজেট: প্রায় ১২–১৪ কোটি টাকা
অনিয়ম, প্রশিক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে ভাতা উত্তোলন, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ভাড়া বাবদ অতিমূল্য প্রদর্শন, ট্রেনিং কিটে ঘাটতি, প্রায় ৩০–৪০% বিল ভুয়া,
একজন কর্মকর্তা বলেন,
রেজ্জাক তখনও একই কায়দায় বিল বানাতেন, শুধু প্রকল্পের নাম বদলাত।
যুব সংগঠন উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পvমোট বাজেট: প্রায় ৮–১০ কোটি টাকা
অভিযোগ, সংগঠনগুলোর প্রকৃত সদস্য দেখানো হয়নি,মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম কাগজে দেখানো, সামাজিক কার্যক্রমে অতিমূল্যে বিল,
অডিট মন্তব্য, ব্যয়ের বড় অংশের কোনো যৌক্তিক প্রমাণ নেই। অভিযোগ উঠছে, মাঠ সফরের নামে ব্যাপক TA/DA উত্তোলন করেছেন রেজ্জাক। যুবদের মোবাইল/আইসিটি সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প, মোট বাজেট: ১০–১২ কোটি টাকা,
অনিয়ম, ডিভাইস ক্রয়ে ২৫–৩০% অতিরিক্ত বিল, ল্যাব স্থাপনের খরচ দ্বিগুণ দেখানো, অকার্যকর সরঞ্জামকে কার্যকর হিসেবে চালান,
অডিট ফলাফল, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা স্পষ্ট। সম্ভাব্য আত্মসাৎ: ৩–৪ কোটি টাকা,গ্রামীণ যুব উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি,মোট বাজেট: ৬–৮ কোটি টাকা অনিয়ম,
প্রশিক্ষণ ব্যাচ বাড়িয়ে বিল উত্তোলন, একই দিনে একাধিক জেলার নামে ফিল্ড রিপোর্ট সফল উদ্যোক্তার সংখ্যা ভুয়া দেখানো
সূত্র জানায়, স্থানীয় কর্মকর্তাদের কমিশনের অংশ ফেরত দিতে হতো, আর ঠিকাদারদের সঙ্গে কমিশন ভাগাভাগির হার ছিল ১৮–২৫% পর্যন্ত।
প্রশ্ন উঠছে — রেজ্জাকের অনিয়মের ছক ছিল একই, তিন বছরের অনুসন্ধান, অডিট নথি ও কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারে যে প্যাটার্নটি স্পষ্ট, তা হলো— ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী দেখানো, টেন্ডার কারচুপি, অডিট টিমকে ম্যানেজ করা
আত্মীয়দের নামে সম্পদ রেজিস্ট্রি, পেনশন নিশ্চিত করে হঠাৎ দায়িত্ব ত্যাগ
তথ্য বলছে, এসব প্রকল্পে তিনি নিয়মিত ঘুষ, কমিশন ও মিথ্যা ব্যয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন।অস্বাভাবিক সম্পদ, বেতন নয়, ‘প্রকল্পের কমিশনই’ প্রধান উৎস, বিএফআইইউ ও অভ্যন্তরীণ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার নিকুঞ্জে বহুতল বাড়ি, ধানমন্ডি ও জিগাতলায় ফ্ল্যাট,জামালপুরে পাঁচতলা বাড়ি
নারায়ণগঞ্জে জমি, ছেলের যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এসব সম্পদের বেশিরভাগই স্বজনদের নামে রেজিস্ট্রি করা, যা অস্বাভাবিক সম্পদ সঞ্চয় হিসেবে ধরা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ।
অভিযোগ উঠছে, দুর্নীতির অভিযোগের পরেও রেজ্জাক পেনশনের সব কাগজ সম্পন্ন করে দায়িত্ব থেকে অবসরে যান। প্রশাসনের একটি সূত্র বলছে, তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি ফাইল ক্লোজ করে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও আব্দুল রেজ্জাকের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
অর্থনীতি ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে,যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের আগে থেকেই কমিশন ভাগাভাগির হিসাব নির্ধারিত থাকে। আব্দুল রেজ্জাকের কেসটি এই দুর্নীতির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার স্পষ্ট উদাহরণ। তাঁরা মনে করেন, একজন প্রকল্প পরিচালকের এমন অপব্যবহার শুধু অর্থ নয়, বেকার যুবকদের ভবিষ্যৎও ধ্বংস করছে।
সব তথ্য মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে — আব্দুল রেজ্জাক যে প্রকল্পেই দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানেই অনিয়ম, অতিমূল্য, ভুয়া বিল, ও অডিট কারচুপির ছাপ স্পষ্ট।
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পের ১০ কোটি টাকার আত্মসাৎ আসলে তাঁর দীর্ঘদিনের দুর্নীতির কাহিনির শেষ অধ্যায় মাত্র।
প্রশ্ন উঠছে — এত বছরের ঘুষ-বাণিজ্য, আত্মসাৎ ও অডিট জালিয়াতির পেছনে কারা ছিলেন তাঁর সহায়তাকারী?
আর প্রশাসন এতদিন নীরব ছিল কেন?
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্নীতির ধারা শুধুমাত্র সরকারি অর্থ নয়, তরুণ প্রজন্মের বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।