উদয়ের পথে
দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এতে সময়মতো চিকিৎসাসেবা না পেয়ে বন্দিদের মৃত্যুহার বাড়ছে বলে তথ্য বলছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার থেকে শুরু করে পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার—কোনো সময়েই এই দীর্ঘদিনের সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ৯৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৫৫ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪২ জন মারা যান। তথ্য বলছে, আগের বছরগুলোতেও মৃত্যুর হার ছিল উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালে মোট ২৭০ জন বন্দির মৃত্যু হয়। এর মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু ১৫৫ জন, হাসপাতালে নেওয়ার পথে ১১১ জন এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু ৪ জনের।
২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ২৬১ জনের—স্বাভাবিক ১৪০, হাসপাতালে নেওয়ার পথে ১২০ এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু ১ জন।
২০২৩ সালে মোট মৃত্যু ছিল ২৯০ জন—স্বাভাবিক ১৮৭, হাসপাতালে নেওয়ার পথে ১০১ এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু ২ জন।
এই হিসাবে, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাস পর্যন্ত মোট ৮২১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২২ জন বন্দির মৃত্যু ঘটছে। প্রশ্ন উঠছে, এই মৃত্যুগুলো কতটা প্রতিরোধযোগ্য ছিল।
সূত্র জানায়, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৪৬টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক আছেন মাত্র দুইজন। ফলে বন্দিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশে বর্তমানে ৬৮টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ কারাগার ও রাজশাহী ট্রেনিং সেন্টারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে খণ্ডকালীন চিকিৎসক দিয়ে সেবা চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে তীব্র অ্যাম্বুলেন্স সংকট। ৬৮টি কারাগারের বিপরীতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি। অভিযোগ উঠছে, অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পথেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
কারা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক সময় ভাড়া করা গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা পৌঁছাতে দেরি করে। এতে চিকিৎসা বিলম্বিত হয় এবং ঝুঁকি বাড়ে।
কারাগারগুলোতে আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বিদ্যমান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক বন্দির আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৬ জন বন্দি। ২০২৪ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ২ জন, ২০২২ সালে ৪ জন এবং ২০২১ সালে ৪ জন বন্দি আত্মহত্যা করেন। প্রশ্ন উঠছে, কারাগারের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কতটা কার্যকর।
কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। বর্তমানে মাত্র দুইজন চিকিৎসক স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন, বাকিরা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হতো, এতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেত।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসক সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে, তবে এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
অ্যাম্বুলেন্স সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক সময় বাইরে থেকে গাড়ি আনতে হয়, এতে বিলম্ব হয় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমাধানের আশ্বাস দিলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান নয়।
প্রশ্ন উঠছে, বন্দিদের মৌলিক চিকিৎসা অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন