নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর বনানী থানার পরিদর্শক (অপারেশন) এ কে এম মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন স্পা ও সীসা বারে “মাসিক ঘুষের বিনিময়ে সহযোগিতা” করার অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্র জানায়, অভিযোগ রয়েছে—আইন, নিয়ম বা বিধি দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন স্পা ও সীসা লাউঞ্জগুলোতে অভিযান না চালানোর বিনিময়ে “মাসোয়ারা” নেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যক্রম চলে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন দাবি করেছেন, টাকা উদ্ধার, জমি–সংক্রান্ত বিরোধ বা পারিবারিক সমস্যার মতো মামলায় থানায় আটকে রাখা বা মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সদর দপ্তর এসব বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিলেও “এ নির্দেশনা মানা হয়নি”—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা ও কয়েকটি অনুসন্ধানী সূত্র জানায়, কড়াইল বস্তির কয়েকটি স্পটে নিয়মিত মাদক বিক্রি হয়—এমন দাবি দীর্ঘদিনের। “এই স্পটগুলো থেকে মাসোয়ারা নেওয়া হয়”—এ অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো সরকারি দলিল পাওয়া যায়নি।
কিছু বাসিন্দা বলেন, “সন্ধ্যা–রাতে কিছু স্থানে খোলাখুলি মাদক বিক্রি হয়। পুলিশি তৎপরতা থাকলেও পুরো চক্রটি টিকে আছে।”—তবে তারা কেউ পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র জানায়, বনানী ও আশপাশ এলাকায় ৩৬০ ডিগ্রি সিসা লাউঞ্জ, কিউডিএস, ৩২ ডিগ্রি, সেলসিয়াস, আরগিল লাউঞ্জ, এস্কেটিক লাউঞ্জসহ বেশ কয়েকটি সীসা বার রয়েছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে আগে থেকেই বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য বলছে, রাতে এসব প্রতিষ্ঠানে মদ, সীসা ফ্লেভারের পাশাপাশি গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক সেবন হয়। ধনী পরিবারের তরুণ–তরুণীদের নিয়মিত উপস্থিতির কথাও স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানান। প্রশ্ন উঠছে—এসব স্পষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চালু থাকে?
২০২৩ সালে ৩৬০ ডিগ্রি সিসা লাউঞ্জে ইন্টারনেট উদ্যোক্তা রাহাত হোসেন রাব্বীর মৃত্যু ঘটার পর তদন্তে পরিদর্শক এ কে এম মঈন উদ্দিন দায়িত্ব পান। কয়েকটি সূত্র দাবি করে, এই সময়ের পর বেশ কয়েকটি সীসা বারের মাসোয়ারার পরিমাণ “দিগুণ হয়”—তবে এই দাবির কোনো স্বতন্ত্র যাচাই পাওয়া যায়নি।
খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানায়, প্রতিটি সীসা বার থেকে প্রতি মাসে ৩–৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠানোর অভিযোগ আছে। আবার অন্য একটি সূত্র জানায়, “টাকা নেওয়া হলে তা কখনো কখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে নেওয়া হয় বলে বলা হয়।”—যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বনানীর আলোরী স্পা, স্পা সারিনি, হ্যাপি আওয়ার, ব্লিস স্পা, ঢাকা বডি কুইন স্পা, জি স্পা সিগনেচার—এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকে জানায়, অধিকাংশ স্পার কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। কিছু সূত্র বলছে, “মাসিক ঘুষের বিনিময়ে এসংক্রান্ত কার্যক্রম চলতে দেওয়া হয়।”
একজন প্রাক্তন কর্মী জানান,
“স্পাগুলোর আড়ালে অন্য ধরনের সেবা দেওয়া হয়। বাইরে থেকে পুলিশি সহযোগিতা আছে বলেই টিকে থাকে। তবে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে এমন কোনো সরকারি নথি পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানায়, বনানীর কিছু স্পা ও সীসা বার ব্যবহার করে একটি “মাদক নেটওয়ার্ক” সক্রিয় রয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, এই নেটওয়ার্কে অল্পবয়সী নারীও ব্যবহৃত হয়। যদিও এসব অভিযোগ সরাসরি প্রমাণ করা কঠিন এবং এখনো কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম মানবপাচার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ আদালতে উপস্থাপিত হয়। এ ঘটনায় আদালত আইজিপিকে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী, বনানী থানার ওসি রাসেল সরোয়ার হাজির হয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে ক্ষমা চান। এই ঘটনা সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে—গ্রেপ্তারের পর ছাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে কার ভূমিকা ছিল?
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন—মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, থানা হাজতে আটকে রেখে আর্থিক সুবিধা নেওয়া, মাদক ব্যবসায় সহায়তা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাত”—এমন নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে।
তারা আরও বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীরা মাসোয়ারা দিয়ে অবাধে ব্যবসা করে। সাধারণ মানুষ থানায় ন্যায়বিচার পায় না। এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কোনো মন্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত : আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকেরা বলছেন—পুলিশের জবাবদিহি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন
অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো কর্মকর্তা দোষী বা নির্দোষ বলা যায় নাস্পা ও সীসা বারের লাইসেন্সিং–ব্যবস্থা স্বচ্ছ না হলে।