অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Sep 18, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ডেমুর পর এবার লাগেজ ভ্যান: ৩৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ভরাডুবি


ডেমুর পর এবার লাগেজ ভ্যান: ৩৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ভরাডুবি

 নিজস্ব প্রতিবেদন ঈশ্বরদী (পাবনা) 

ডেমু ট্রেনের ব্যর্থতার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের আলোচনায় এসেছে রেলওয়ের নতুন কেনাকাটা। প্রায় ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে আনা ১২৫টি লাগেজ ভ্যান আজ অধিকাংশ সময় অলস পড়ে আছে বিভিন্ন স্টেশনে। যাত্রীবাহী আন্তঃনগর ট্রেনে মালামাল পরিবহনের জন্য যুক্ত হলেও ব্যবহার হচ্ছে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ। ঈশ্বরদী, রূপপুর ও পার্বতীপুর স্টেশনে সারি সারি ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্য যেন রেলওয়ের পরিকল্পনার ঘাটতিকে প্রকাশ করছে চোখে আঙুল দিয়ে।


২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি ডেমু ট্রেন আমদানি করে রেলওয়ে। প্রতিশ্রুতি ছিল, এসব ট্রেন কমপক্ষে ৩০ বছর চলবে। কিন্তু বাস্তবে পাঁচ–সাত বছরের মাথায়ই একে একে অকেজো হয়ে পড়ে। ২০২১ সালের মধ্যে ডেমুগুলো পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করতে হয়।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শেষে জানায়, প্রকল্পে অনিয়ম ও অপরিকল্পিত ব্যয়ের কারণে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রের। এ ঘটনায় রেলওয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. তোহিদুল আনোয়ার চৌধুরীসহ সাতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে সংস্থাটি। দুদকের নথিতে অভিযোগ আনা হয়েছে—প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ঘাটতি, সিদ্ধান্তহীনতা ও ব্যয়ের অসঙ্গতির কারণে এ ক্ষতি হয়েছে। তবে অভিযুক্ত সাবেক মহাপরিচালকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রেলের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ডেমুর মতো লাগেজ ভ্যান কেনাকাটাতেও সেই একই ধরনের অদক্ষতা ও অপরিকল্পিত ব্যয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান দেশে আনা হয়। এর মধ্যে ৭৫টি মিটার গেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ। ভ্যানগুলোর মধ্যে ২৮টি ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেফ্রিজারেটর ভ্যান। প্রতিটি মিটার গেজ ভ্যানের দাম ধরা হয় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং প্রতিটি ব্রডগেজ ভ্যানের দাম ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা।

কিন্তু এসব ভ্যানের ব্যবহার খুবই সীমিত। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) হাসিনা বেগম বলেন,
“আমরা আন্তঃনগর ট্রেনে নতুন ১৫টি লাগেজ ভ্যান চালু করেছি। কিন্তু সমস্যাটা হলো—এগুলোতে মালামাল ওঠানো–নামানো যায় শুধু শুরু আর শেষ স্টেশনে। মাঝপথের স্টেশনে সময় না থাকায় এগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না।”

তার মতে, এ সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন ভ্যান থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরোনো লাগেজ ভ্যানই এখনো বেশি কার্যকর। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) বলেন,
“লোকাল ও মেইল ট্রেন প্রতিটি স্টেশনে যথেষ্ট সময় দাঁড়ায়। মালামাল ওঠানো–নামানো সহজে করা যায়। তাই পুরোনো ভ্যান থেকেই বেশি আয় হচ্ছে।”

২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাকশী বিভাগে নতুন ভ্যান থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। একই সময়ে লালমনিরহাট বিভাগে আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকার কিছু বেশি। কর্মকর্তাদের ভাষায়, এ আয় প্রত্যাশার তুলনায় অতি সামান্য।

২০২৪ সালের অক্টোবরে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়। খুলনা–ঢাকা, পঞ্চগড়–ঢাকা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ–ঢাকা রুটে সাতটি নতুন লাগেজ ভ্যান ব্যবহার করে তিনটি বিশেষ ট্রেন চালু হয়েছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহও টেকেনি সেগুলো।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কৃষক বাদশা বলেন,“রেলপথে ভাড়া বেশি, সময়ও বেশি লাগে। তার ওপর বারবার মাল তুলতে–নামাতে হয়, এতে মান নষ্ট হয়। কৃষকেরা তাই সড়কপথে মাল পাঠাতেই বেশি ভরসা করেন।

বর্তমানে ঈশ্বরদী, রূপপুর ও পার্বতীপুর স্টেশনে প্রায় ৩৫টি নতুন লাগেজ ভ্যান পড়ে আছে। এর মধ্যে ১২টি রেফ্রিজারেটর ভ্যান। রেলওয়ের ভেতর থেকে জানা গেছে, ভ্যানগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।

তবে একাধিক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, কেনার আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছিল কি না। প্রকল্প অনুমোদনের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপ ছিল কি না—সেই প্রশ্নও উঠে আসছে।



রেলওয়ের পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“ডেমুর মতো লাগেজ ভ্যান প্রকল্পও প্রমাণ করছে, বড় কেনাকাটার আগে মাঠপর্যায়ের চাহিদা যাচাই করা হয়নি। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে।”

দুদকের একজন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, লাগেজ ভ্যান প্রকল্পের আর্থিক দিকও খতিয়ে দেখা হতে পারে।

ডেমু প্রকল্পের ব্যর্থতা আজও রেলওয়ের কাঁধে বোঝা হয়ে আছে। এখন নতুন লাগেজ ভ্যান কেনাকাটাও একই পথে হাঁটছে। স্টেশনে পড়ে থাকা কোটি টাকার ভ্যানগুলো প্রমাণ করছে—পরিকল্পনার দুর্বলতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা কীভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

তবে রেলের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। সঠিক নীতিমালা, স্টেশনভিত্তিক সুবিধা বাড়ানো ও বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা গেলে ভ্যানগুলো কাজে লাগানো সম্ভব।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—ডেমুর মতোই কি এই প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের নতুন উদাহরণ হয়েই থাকবে?


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী নিহত

1

গাজাযুদ্ধে ১৯ হাজার শিশু হত্যা করেছে ইসরায়েল

2

কে সাংবাদিক আর কে ফার্মাসিস্ট বোঝা মুশকিল: ড. দেবপ্রিয় ভট্টা

3

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর ‘ডাহা মিথ্যা’ — প্

4

টাঙ্গাইল শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে ৭ দিনের কর্মসূচি শুরু

5

নববর্ষ উদযাপনে কোনো হুমকি নেই : র‍্যাব ডিজি

6

প্রশিক্ষণ শেষের দিনেই চাকরিচ্যুত ৩ ম্যাজিস্ট্রেট

7

খুলনা বিএনপির তিন প্রবীণ নেতার ঐক্য, তৃণমূলে জাগরণ

8

গণপূর্তে ‘ বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট, ভাঙতে চান মন্ত্রী-প্রতিমন

9

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০ শতাংশ শুল্ক নিশ্চিত করা সরকারের বড় স

10

কেসিসির প্রশাসক হিসেবে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর দায়িত্ব গ্রহণ

11

কক্সবাজার রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগে প্রধান সহ

12

ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠক

13

জয়পুরহাটে নিখোঁজের তিন দিন পর শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার

14

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর নাম ঘোষণা

15

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকার বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার

16

প্রবাসীর স্ত্রীর হাত ধরে ‘নিখোঁজ’ পুলিশ কর্মকর্তা

17

চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ও প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন অ্যাপ ১৮ নভেম্ব

18

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান ডিআরইউয়ের

19

"মাঠে রাজনীতি নয়, মানুষের পাশে থাকতে এসেছি" — কর্নেল (অব.) আ

20