অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Apr 19, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

অবসরে গিয়েও রেহাই নেই, পাঁচ সাবেক অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান


২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাচনী অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগে সাবেক পাঁচ অতিরিক্ত সচিবের অতীত ভূমিকা খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ উঠছে, এদের প্রত্যেকেই ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছিলেন। এখন তাদের আর্থিক লেনদেন, সম্পদের হিসাব, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের আওতায় থাকা পাঁচ কর্মকর্তা হলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান, ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, রাব্বী মিয়া, তন্ময় দাস এবং মো. শওকত আলী। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—জেলা প্রশাসক থাকাকালে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মে ভূমিকা রাখা এবং পরে প্রশাসনে প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন করা।

জানা গেছে, দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম–এর নেতৃত্বে একটি দল তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের তালিকা চাওয়া হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়–এর কাছে। পরে সেই তালিকার ভিত্তিতে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান। তিনি আগে কুড়িগ্রাম–এর জেলা প্রশাসক ছিলেন। পরে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয় এবং তিনি পরিকল্পনা কমিশন–এ অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ উঠছে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো এবং সম্পদের তথ্য গোপনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।

দুদকের হাতে থাকা নথি অনুযায়ী, ফেরদৌস খান তার আয়কর নথিতে কয়েকটি জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য দেখিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, তিনি অন্তত ১৮ লাখ টাকার একটি এফডিআরের তথ্য গোপন রেখেছেন। তথ্য বলছে, তার ঘোষিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি টাকার বেশি হলেও, গোপন সম্পদ যুক্ত করলে তা ২ কোটির বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, আয়কর নথিতে উল্লেখ না থাকা এই সম্পদের উৎস কী এবং তা বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

তন্ময় দাসের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি নোয়াখালী–এর জেলা প্রশাসক ছিলেন। পরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–এ দায়িত্ব পালনকালে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্প–এ প্লট বরাদ্দ–সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, এই অনিয়মের ঘটনায় পরবর্তীতে মামলা হয় এবং আদালতে অভিযোগপত্রও জমা পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে প্লট বরাদ্দে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন।

ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি জেলা প্রশাসক থাকাকালে নিয়োগে অনিয়ম করেছেন এবং বয়স গোপন করে কিছু ব্যক্তিকে চাকরি দিয়েছেন। তথ্য বলছে, তিনি দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। একইভাবে রাব্বী মিয়া ও শওকত আলীর বিরুদ্ধেও নির্বাচনী প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরে দ্রুত পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী অনিয়ম, সম্পদ গোপন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল, তারা কীভাবে পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি পেয়েছেন? আবার যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাদের অনেককে দীর্ঘদিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও রাখা হয়েছিল। প্রশাসনের ভেতরে কি রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্ক পদোন্নতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে—এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনের পর অনেক কর্মকর্তাই দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক আনুগত্য ও রাজনৈতিক বিবেচনা অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। যারা মাঠপর্যায়ে সরকারের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করা হয়েছে, তাদের কেউ কেউ দ্রুত পুরস্কৃত হয়েছেন।”

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে শুধু সম্পদের হিসাব নয়, ব্যাংক লেনদেন, জমি ক্রয়, ফ্ল্যাট, সঞ্চয়পত্র, স্বর্ণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, বিআরটিএ তথ্য এবং ভূমি রেকর্ডও যাচাই করা হবে। তিনি বলেন, “শুধু ঘোষিত সম্পদ নয়, জীবনযাত্রার মান, পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ এবং বেনামি বিনিয়োগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

দুর্নীতি দমন কমিশন–এর সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অভিযোগের ধরন যদি শুধু সম্পদ গোপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নির্বাচনী প্রভাব, অবৈধ লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের পর মামলা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।”

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ২২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন সচিব, ১৮ জন অতিরিক্ত সচিব, একজন যুগ্মসচিব এবং একজন উপসচিব ছিলেন।

ড. মো. মোখলেস উর রহমান গত বছর সাংবাদিকদের বলেন, অবসরে গেলেই কেউ দায়মুক্তি পাবেন না। চাকরিতে থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা দুদকে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজন হলে মামলা করা হবে।

প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাধ্যতামূলক অবসর দিলেই দায় শেষ হয় না। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, সম্পদের উৎস যাচাই এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রশাসনে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যদি নির্বাচনী অনিয়ম, সম্পদ গোপন ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের বিচার না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যাবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে আরও ৩টি গ্রাম দখল করেছে রাশিয়া

1

গুলশান প্লট দখল মামলায়: সালাম মুর্শিদীর বিরুদ্ধে চার্জফ্রেম

2

ওপেনএআইয়ের ‘সোরা’ অ্যাপ এবার অ্যান্ড্রয়েডে।

3

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

4

নোয়াখালী বিভাগের দাবিতে কোম্পানীগঞ্জে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও র

5

সাবেক ডিজি ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে ৪২ কোটি আত্মসাতের অভিযোগ:

6

যৌতুকের দাবিতে নির্মম নির্যাতন, বিজিবি সদস্য মোঃ জসিম উদ্দিন

7

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে শতকোটির দুর্নীতির অভিযোগ, দুদকে অনুসন্

8

মির্জাগঞ্জে জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

9

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ব্যয় নিয়ে তোলা অভিযোগ ভিত্তিহীন: কমিশনে

10

৪৮ রানে ৭ উইকেট হারাল পাকিস্তান, ওয়ারিকানের স্পিন–ঘূর্ণি

11

হবিগঞ্জে ৫৩ কেজি গাঁজাসহ ২ জন আটক

12

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিতে পুলিশের বড় উদ্যোগ

13

মহাস্থান হাটে সবজির দাম স্থিতিশীল, সরবরাহ ভালো

14

ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী নিহত

15

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান

16

কাজের মান নিয়ে বিরোধে প্রকৌশলীকে ধাওয়া

17

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

18

গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিন থেকে মার্কিন নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার

19

সরকারের পাওনা ১২৬ কোটি টাকা, ফাঁকি দিতে অভাবনীয় জালিয়াতি ওসম

20