উদয়ের পথে
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে রাখতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে। সংসদে দাবি জানানো, মুলতবি প্রস্তাব ও ওয়াকআউটের পর এবার রাজপথে ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জোটটি।
৭ এপ্রিল রাজধানীর আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জোটটির নেতারা জানান, সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের পাশাপাশি জনমত গঠনে সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, প্রচারপত্র বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হবে।
এর আগে ২ এপ্রিল রাজধানীতে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠক থেকেই ৪ এপ্রিল বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। একই দিন সমাবেশ থেকে সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে আন্দোলনের কৌশল ও রূপরেখা নির্ধারিত হতে পারে। তবে আন্দোলন সহিংস হবে না। সংস্কারের বিষয়ে জনমত গঠনে লিফলেট বিতরণ, সেমিনার, গণসংযোগ ও মিছিল থাকবে।
লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
৪ এপ্রিলের কর্মসূচির পর ৬ এপ্রিল একটি অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল সংসদ থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং রাজপথের আন্দোলন শুরু হয়েছে। পরদিন ৭ এপ্রিল সারা দেশে সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, যার মধ্যে গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, সেমিনার ও বিক্ষোভ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১১-দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, “গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নই এখন ১১ দলের মূল দাবি। জুলাই সনদের সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়গুলো আগে কার্যকর করতে হবে। সরকার জন–আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়ন করছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে এই কর্মসূচি দেওয়া হবে।
জোট-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সংসদে জুলাই সনদ আলোচ্যসূচিতে থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই। এ কারণে সংসদের পাশাপাশি রাজপথে চাপ তৈরির কৌশল নেওয়া হয়েছে। গত ২৯ মার্চ সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবিতে মুলতবি প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরদিন একই বিষয়ে আরেকটি প্রস্তাব এলেও সেটিও অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর প্রতিবাদে ১ এপ্রিল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের প্রস্তাব ‘ধামাচাপা’ দিতে বিকল্প প্রস্তাব আনা হয়েছে এবং সরকার সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে জোটটি। পাশাপাশি বিএনপির বাইরে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বিরোধীদলীয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি বিল আকারে না আনার সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি, যার ফলে ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকছে না। এতে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল।
এদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। সংগঠনটির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, এ দাবিতে তাদের কর্মসূচি চলমান থাকবে। অন্যদিকে, ১১ দলের বাইরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১০ এপ্রিল দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ২৪ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এখনো পরিষদ গঠন হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে সংসদের বাইরে রাজপথে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ১১-দলীয় ঐক্য।