স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন অস্থিরতার ভেতরে ব্যাংকিং খাত বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আস্থার সংকটে ভুগছে।
“তথ্য বলছে”, সাম্প্রতিক সময়ের সংস্কার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেও বেশ কিছু ব্যাংকের নেতৃত্বে এখনো বিতর্কিত ব্যক্তিরা রয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি—সিটি ব্যাংক পিএলসি এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন।
সরকারের ক্ষমতাসীন সময়কালজুড়ে ব্যাংকটি যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে একদিকে প্রশ্ন উঠেছে পেশাদারিত্ব নিয়ে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাবের গভীর ছায়া নিয়েও।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সিটি ব্যাংকে বর্তমানে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয়ভাবে একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত—যা ব্যাংকিং প্রথার স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের উত্থান
তথ্য অনুযায়ী”, মাসরুর আরেফিনের জন্ম বরিশালে, শৈশব কেটেছে খুলনায়, আর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন কলকাতায়।১৯৯৫ সালে ব্যাংকিং খাতে প্রবেশ করে তিনি কাজ করেছেন একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে।২০০৭ সালে সিটি ব্যাংকে যোগ দেন—এবং পরবর্তী ১২ বছরে ধাপে ধাপে উঠে আসেন শীর্ষপদে।২০১৯ সালে তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ পান।তখন থেকেই, “সূত্র জানায়”, তার প্রশাসনিক ধরন ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় নানা আলোচনা শুরু হয়।
অর্থনৈতিক সাংবাদিক রুহুল আমিনের মতে—মাসরুর আরেফিনের উত্থান শুধুই পেশাগত যোগ্যতার কারণে নয়, এর পেছনে রাজনৈতিক অনুগ্রহের বিষয়টিও স্পষ্ট।
সাহিত্য ও রাজনৈতিক ভাবধারার সংযোগ
একটি বিশেষ দিক হলো—ব্যাংকার পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেন লেখক ও উপন্যাসিক হিসেবে।
তার লেখা “আগস্ট আবছায়া” উপন্যাসটি ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়, যেখানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনাকে রূপক আকারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।তথ্য বলছে, বইটি প্রকাশের সময় তিনি সিটি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ছিলেন।
একাধিক প্রকাশনা সূত্র জানায়, বইটি সরকারি ও রাজনৈতিক মহলে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেন—এ ধরনের বই প্রকাশ ও রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে কর্পোরেট প্রভাব অর্জনের প্রবণতা নতুন নয়; কিন্তু ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে এটি স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—
একজন ব্যাংক নির্বাহী, যিনি রাষ্ট্রীয় আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন, তার রাজনৈতিক বা আদর্শিক ঝোঁক কি পেশাগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে না?
কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও প্রশাসনিক একচ্ছত্রতা
২০১৯ সালে সিটি ব্যাংকের সাবেক সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিরা সুলতানা পপি ঢাকায় একটি মামলা করেন, অভিযোগ করে যে, ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—যার মধ্যে এমডির নামও উল্লেখ করা হয়েছিল—তাকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়।
মনিরা সুলতানা সে সময় গণমাধ্যমে বলেছিলেন,
আমি প্রতিনিয়ত মানসিক ও শারীরিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছিলাম। কুপ্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় আমাকে বেআইনিভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে সে সময় একটি বিবৃতিতে বলা হয় যে, অভিযোগ “ভিত্তিহীন” এবং প্রতিহিংসামূলক উদ্দেশ্যে দায়ের।তবে মামলা আদালতে চলমান থাকলেও এর পরবর্তী আপডেট প্রকাশ্যে আসেনি। তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতের একাধিক কর্মকর্তা গোপনে জানিয়েছেন যে, প্রতিষ্ঠানটিতে “অধিকারের কেন্দ্রীয়ীকরণ” নিয়ে ভীতি রয়েছে।
একজন প্রাক্তন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন—এখানে কেউ প্রশ্ন করতে সাহস পায় না। শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশই নীতি হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও কর্পোরেট দাননীতি
সিটি ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
সূত্র জানায়”, সরকারি দিবস, উদযাপন ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের দান (ডোনেশন) দেওয়া হয়েছে।তবে ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, এসব ছিল “কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ”, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদিত কাঠামোর মধ্যেই দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা বলছেন—যখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বোর্ড ও এমডি যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তখন কর্পোরেট ডোনেশনের সীমা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
একজন প্রাক্তন সিটি ব্যাংক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,ব্যাংকটি একসময় পেশাদারিত্বে এগিয়ে ছিল। কিন্তু গত দশকে এটা একধরনের দলীয় ‘পেট্রনেজ সিস্টেম’-এ রূপ নিয়েছে।
ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনে নেতৃত্ব ও প্রভাব
মাসরুর আরেফিন বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান পদেও রয়েছেন। তথ্য বলছে”, এই পদে থেকে তিনি নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করেন, যা পুরো খাতেই প্রতিফলিত হয়।
একজন অর্থনীতি গবেষক মন্তব্য করেন—যখন একটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি একই সঙ্গে ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হন, তখন স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) তৈরি হয়। এটি নীতি প্রয়োগে নিরপেক্ষতা হ্রাস করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তদারকি প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের অনেকে স্বীকার করেছেন যে,বড় ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি সবসময় সমানভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।
একজন সাবেক উপ-গভর্নর বলেন—কিছু ব্যাংকের রাজনৈতিক সুরক্ষা থাকলে নীতিনির্ধারকেরাও অনেক সময় নিরব থাকেন। এই সংস্কৃতি ব্যাংকিং শৃঙ্খলার জন্য হুমকি।
তথ্য বলছে, সিটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কখনও সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি, বরং বেশ কয়েকবার শুধুমাত্র সতর্কতামূলক চিঠি দিয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা ও আশঙ্কা
সম্প্রতি ব্যাংক খাতে তথ্য ফাঁস, সার্ভার হ্যাকিং ও লেনদেন বিকৃতি নিয়ে নানা ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন—যদি কোনো ব্যাংকের আইটি বিভাগ বা পরিচালন ব্যবস্থা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিক প্রভাবাধীন হয়, তাহলে আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ে।
সূত্র জানায়, সিটি ব্যাংকের আইটি ও অপারেশন ইউনিটে নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও, অভ্যন্তরীণ পরিবেশে কর্মীরা খোলামেলা মতামত দিতে পারেন না।
বিনিয়োগ আস্থা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
তথ্য বলছে, সিটি ব্যাংক বর্তমানে সম্পদমূল্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি। তবে বিগত পাঁচ বছরে ব্যাংকের শেয়ারমূল্যে ওঠানামা ও আমানত বৃদ্ধির হার স্থবির ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বাজার আস্থার ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে।
একজন শেয়ার বিশ্লেষক বলেন—যখন একটি ব্যাংক নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন তার আর্থিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের চোখে সন্দেহের জন্ম দেয়।
ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ
সাবেক কর্মকর্তা মনিরা সুলতানার মতো আরও কয়েকজন কর্মী অভিযোগ করেছেন যে, ব্যাংকের অভ্যন্তরে “অতিরিক্ত কর্তৃত্ববাদী পরিবেশ” তৈরি হয়েছে।
তবে ব্যাংক প্রশাসন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে,
আমরা শৃঙ্খলাভঙ্গের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি। কোনো ব্যক্তিগত পক্ষপাত নেই।
একজন বর্তমান কর্মকর্তা গোপনীয়ভাবে বলেন—সিটি ব্যাংকে এখন সিদ্ধান্তের গণতন্ত্র নেই। ভয়, আনুগত্য ও রাজনৈতিক হিসাব একসঙ্গে মিশে গেছে।
অর্থনীতি গবেষক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন—একটি ব্যাংকের নেতৃত্ব যদি রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত হয়, তবে সেটি কেবল ঐ প্রতিষ্ঠানের নয়, গোটা খাতের ঝুঁকি তৈরি করে।
অন্য এক ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ মত দেন—দীর্ঘ সময় একজন এমডির দায়িত্বে থাকা, বিশেষ করে তিন মেয়াদ ধরে, প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ছিল সময়োপযোগী রোটেশন নিশ্চিত করা।
আস্থা পুনর্গঠনের সময়
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব পুনর্গঠন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সিটি ব্যাংক ও এর এমডি মাসরুর আরেফিনকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলো হয়তো ব্যক্তিগত নয়—এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কার-প্রয়াসের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠছে—যদি একটি ব্যাংকের নেতৃত্ব দলীয় ছায়ায় থেকে নির্বিঘ্নে টিকে যায়, তাহলে সাধারণ আমানতকারীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকার—তারা কি স্বচ্ছতার এই পরীক্ষায় সফল হবে?
তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়ার ওপর।
মন্তব্য করুন