ড্যাপ সংশোধনে ঐতিহাসিক গতি: রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে
ড্যাপ সংশোধনে ঐতিহাসিক গতি: রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে রেকর্ড সময়ে বড় পরিবর্তন
জাহিদ সুমন:
ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)–এর সংশোধনীর প্রস্তাব অবশেষে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। সরকারের এই অনুমোদনের ভিত্তিতে শিগগিরই ড্যাপ (২০২২–২০৩৫) গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে—যা নগর পরিকল্পনার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু বছর ধরে স্থবির হয়ে থাকা ড্যাপ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে যে গতিতে অগ্রগতি ঘটেছে, তা “আগের কোনো চেয়ারম্যানের সময় হয়নি।”
সূত্র জানায়, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ৩৫টির বেশি সভা, অংশীজনের মতামত ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে এই অনুমোদন নিশ্চিত করা হয়েছে—যা অতীতে একাধিকবার আটকে গিয়েছিল।
ড্যাপ ২০২২–২০৩৫ হলো রাজধানী ঢাকাকে একটি পরিকল্পিত নগরীতে রূপান্তরের একটি বৃহৎ রূপরেখা। এতে রয়েছে নগর ঘনত্ব, ভবন নির্মাণের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (ফার), কৃষিজমি সংরক্ষণ, জলাধার রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবহন অবকাঠামো ও বন্যা ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধারা।
তথ্য বলছে, ড্যাপের প্রাথমিক খসড়া ২০১৫ সালে তৈরি হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ভূমি ব্যবহার বিরোধ, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে একাধিকবার সংশোধনী প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।
প্রশ্ন উঠছে—যে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বসবাসযোগ্যতার মান পাল্টে যেতে পারে, সেটি এতদিন কেন ঝুলে ছিল?
পরিকল্পনাবিদদের মতে, বিষয়টি জটিল ছিল একাধিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের অগ্রাধিকার ও আপত্তির কারণে।
রোববার গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ড্যাপ বাস্তবায়ন মনিটরিং ও সংশোধনী সুপারিশ কমিটির সভায় এই নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সেতু বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা।
এই সভায় উপস্থিত রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান—“এটি ঢাকাকে বাসযোগ্য করার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। এই অনুমোদন দেখিয়েছে যে—সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় থাকলে জটিল প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব।
ড্যাপ সংশোধনের মূল পয়েন্টগুলো, ফার ও জনঘনত্ব বৃদ্ধি। ধানমন্ডি ও গুলশান ছাড়া রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় ভবন এক থেকে দোতলার বেশি করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এতে নগরায়ণ আরও গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যমান ড্যাপে মুখ্য ও সাধারণ জলস্রোত পৃথক থাকলেও নতুন সংশোধনীতে একত্র করে “বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল” হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এই এলাকায় কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি থাকবে না।
নতুন পরিকল্পনা পদ্ধতি, টিওডি (ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট), রিজেনারেশন এবং ব্লকভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহ দেওয়া হবে।
বিল্ডিং কোডের সঙ্গে সমন্বয়,বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ ও ড্যাপ ২০২২–৩৫–এর সমন্বয়ে ইমারত নির্মাণের বিধান যুগোপযোগী করা হয়েছে। ভয়েড স্পেস, সেটব্যাক, জনঘনত্ব ইত্যাদিতে বিধিবিধানের সংশোধন আনা হয়েছে।
গ্রিন বিল্ডিং ও দুর্যোগ বিবেচনা ,নির্মাণে গ্রিন বিল্ডিং প্রণোদনা, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, এসটিপি বাধ্যতামূলককরণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যানের ভূমিকা, অচলাবস্থা ভেঙে সমাধান।
সূত্র জানায়, অতীতে ড্যাপ সংশোধনীর প্রস্তাব ২০১৯, ২০২০ ও ২০২২ সালে তিনবার মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আটকে যায়। তবে রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে ফাইলগুলো একের পর এক অগ্রসর হয়।
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে যেসব সভায় প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতো, তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকত। এখন নিয়মিত বৈঠক, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে ফাইলগুলো গতি পেয়েছে।”
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “বিগত চেয়ারম্যানদের সময় এমন দ্রুত অগ্রগতি আমরা দেখিনি। এই অনুমোদন সম্ভব হয়েছে মূলত চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব ও ফলো-আপের কারণে।”
আবাসন খাতের প্রতিক্রিয়া, রিহাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে ড্যাপ সংশোধনের অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে এটি অনুমোদনের পথে এগিয়েছে। এতে আবাসন খাতে গতি ফিরবে।
তবে তিনি আরও যোগ করেন—“আমরা চাই এই সংশোধনী যেন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতার মধ্যে না পড়ে। স্বচ্ছ নীতিমালা, জবাবদিহিমূলক অনুমোদন প্রক্রিয়া ও পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সেবা না থাকলে ফার বাড়ানোতেই সব সমস্যার সমাধান হবে না।
নগরবাসীর চোখে প্রশ্ন? যদিও সংশোধনী অনুমোদনকে অনেকেই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন, তবুও
প্রশ্ন উঠছে— জনঘনত্ব বাড়লে অবকাঠামো ও জনসেবার উপর চাপ কিভাবে সামাল দেওয়া হবে?
বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল রক্ষায় কী বাস্তবায়ন ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
রাজউকের ক্ষমতা ও জনবল কি এত বড় পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট?
মিরপুরের এক বাসিন্দা জানান, “আমাদের এলাকায় জনসংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। ফার বাড়লে ভবনও বাড়বে। কিন্তু রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল—এসব বাড়বে তো?”
আরেকজন রামপুরার বাসিন্দা বলেন, “আগে অনুমোদনের ঝামেলায় মাসের পর মাস ঘুরতে হতো। এখন রাজউক যদি সত্যিই প্রক্রিয়া সহজ করে দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত, পরিকল্পনাবিদ
বলেন, “রাজধানীর উন্নয়নে ড্যাপ একটি রূপরেখা মাত্র। মূল কাজ হচ্ছে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। নতুন সংশোধনীতে পরিবেশ সংরক্ষণ ও নগর ঘনত্বে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে রাজউকের বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। রাজুকের চেয়ারম্যান কে আমাদের উৎসাহিত করা উচিত এবং তার পাশে থাকা উচিত।
আরেকজন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বলেন, “বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল রক্ষা না করতে পারলে ঢাকা ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়বে। তাই অনুমোদনের পর মনিটরিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।”
ড্যাপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
তথ্য বলছে, রাজধানীর আবাসন খাতের পরিধি বছরে গড়ে ১৮% হারে বাড়ছে। সংশোধিত ড্যাপ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ লাখ নতুন ফ্ল্যাট নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি হবে—যা আবাসন ও নির্মাণ খাতে হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তন ঢাকার রিয়েল এস্টেট খাতে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে, তবে সঠিক নীতিমালা না থাকলে এটি আবারও অব্যবস্থাপনার নগর” তৈরি করতে পারে। আমি মনে করি রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান ভালো কাজ করছে।
ভবিষ্যতের রোডম্যাপ, রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন,
“আমরা চাই ঢাকাকে শুধু ভবনের শহর না করে একটি কার্যকর ও টেকসই নগর হিসেবে গড়ে তুলতে। ড্যাপ সংশোধনীর মাধ্যমে আমরা অবকাঠামো, জনসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছি। এটি কোনো একদিনের কাজ নয়—এটি একটি প্রক্রিয়া।”
তিনি জানান, ড্যাপ বাস্তবায়নের জন্য রাজউক একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করছে, যেখানে মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম চলবে।
নতুন অধ্যায়ে ঢাকা। বহু বছরের স্থবিরতা পেরিয়ে ড্যাপ সংশোধনীর দ্রুত অনুমোদন ঢাকার নগরায়ণের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।
তথ্য বলছে—সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এটি ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য, পরিকল্পিত ও টেকসই নগরে রূপ দিতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এই পরিবর্তনের মূলে রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নেয়া দ্রুত উদ্যোগই বড় ভূমিকা রেখেছে।
এখন সময়ের অপেক্ষা—এই অনুমোদন কাগজে নয়, বাস্তবায়নের মাটিতে কতটা গতি পায়।
সভা হয়েছে ৩৫টিরও বেশি।
ফার বাড়ছে অধিকাংশ এলাকায়।
বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে জলাধার।
নতুন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কমছে হয়রানি।
রাজউক মনিটরিং সেল গঠন করছে।
মূল বক্তব্য “যা আগের কেউ পারেননি—সেটি এই চেয়ারম্যানের সময়েই সম্ভব হয়েছে” — এমন মতই পাওয়া গেছে একাধিক অংশীজন ও মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে।