নিজস্ব প্রতিবেদক
নোয়াখালীর হাতিয়ার সাগুরিয়া রেঞ্জের সংরক্ষিত বনভূমিতে গাছ কাটা, জমি দখল, বসতি স্থাপন এবং বন ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বনভূমির বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে গেলেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। এতে বন বিভাগের ভূমিকা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চরআলিম বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশ পরিষ্কার করে বসতি স্থাপনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, গত কয়েক মাসে নতুন করে একাধিক ভিটি নির্মাণ হয়েছে এবং সেখানে ঘরবাড়ি তোলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বনভূমিতে বসতি স্থাপন এবং জমি ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
অভিযোগ উঠছে, বন বিভাগের কিছু মাঠপর্যায়ের কর্মচারী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশের সঙ্গে দখলকারীদের যোগাযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, বনভূমি দখলের একাধিক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু এলাকায় গাছ কেটে জমি পরিষ্কার করা হয়েছে। কোথাও চাষাবাদ, কোথাও নতুন বসতি নির্মাণের চিহ্ন রয়েছে। তবে এসব জমি সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভূমি ও বন রেকর্ড যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হেল্প প্রকল্পের আওতায় চরআলিমে ১০০ হেক্টর এবং ভাসানচরে ৩২০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের দায়িত্ব ছিল সাগুরিয়া রেঞ্জের ওপর। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের আওতায় বনসৃজনের দৃশ্যমান অগ্রগতি অনেক এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যয় এবং ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ বিষয়ে সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। বন রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা কাজ করছেন।”
তবে স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, যদি নিয়মিত তদারকি থেকে থাকে, তাহলে সংরক্ষিত বনভূমিতে নতুন বসতি, চাষাবাদ এবং গাছ কাটার ঘটনা কীভাবে ঘটছে?
উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব বনভূমি দখল বা উজাড় হলে পরিবেশগত ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, বনভূমির ডিজিটাল ম্যাপিং, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অডিট জরুরি। অন্যথায় সরকারি অর্থ ব্যয় এবং বন সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে আরও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সাগুরিয়া রেঞ্জের ঘটনাগুলো এখন শুধু বনভূমি দখলের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বন ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের ফলাফলের দিকে এখন তাকিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট মহল।