শেষ সময়ে যা পাই লুটেপুটে খাই”
এলজিইডিতে ২০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের
জাহিদ সুমন :
পিআরএলকে সামনে রেখে ২৫০ জনকে নিয়োগ: এলজিইডিতে ২০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে তীব্র বিতর্ক
শেষ সময়ে যা পাই লুটেপুটে খাই”—অভিযোগের তীরে এলজিইডির এক প্রকল্প পরিচালক
পিআরএলে (পোস্ট রিটায়ারমেন্ট লিভ) যাওয়ার আগ মুহূর্তে ২৫০ জনকে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ দিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আরইউটিডিপি প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবসরের প্রাক্কালে তিনি ‘শেষ সময়ের অবৈধ উপার্জন’কে একপ্রকার “ওপেন সিক্রেট” বানিয়ে ফেলেছেন।
প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর পিআরএল শুরু হচ্ছে আগামী ১০ অক্টোবর থেকে। আর এই সময়টিতেই তার নামে বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে সরব হয়েছে এলজিইডির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নিয়োগ বঞ্চিত অসংখ্য প্রার্থী।
৫ থেকে ১০ লাখ টাকায় চাকরি”—তথ্য বলছে ঘুষ বাণিজ্যের বিশাল অঙ্ক
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আরইউটিডিপি প্রকল্পের আওতায় সহকারী প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলী, কার্যসহকারী, হিসাবরক্ষক, সোসিওলজিস্টসহ একাধিক পদে ২৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয় আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে। অথচ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার চেয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয় ঘুষ ও রাজনৈতিক তদবিরকে, এমন অভিযোগ উঠেছে নিয়োগ বঞ্চিতদের কাছ থেকে।
একাধিক প্রার্থী ও কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়— সহকারী প্রকৌশলী পদে ঘুষের রেট ছিল ১০ লাখ টাকা,
উপসহকারী প্রকৌশলী পদে ৮ লাখ টাকা, এবং অন্যান্য পদে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়।
আমাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরও নিয়োগ দেওয়া হয়নি,”—বলেছেন একজন নিয়োগ বঞ্চিত প্রার্থী।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রথমে বড় ভাইয়ের (মঞ্জুর আলী) দপ্তরে যেতে হয়, তারপর তার ভাই রাজুর সঙ্গে দেখা করানো হয়। সব কিছু একধরনের প্যাকেজের মতো ঠিক করা ছিল।
সূত্র জানায়, প্রায় ৪০০ জন প্রার্থী এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ দিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫০ জনকে। অর্থাৎ প্রায় ১৫০ জন প্রার্থী ঘুষ দিয়েও চাকরি পাননি। শুধু এই নিয়োগ বাণিজ্য থেকেই মোট ২০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর আপন সহোদর রাজু এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী পদে কর্মরত। অভিযোগ আছে, এই নিয়োগ বাণিজ্যের প্রধান “কালেক্টর” ছিলেন রাজু নিজে।
এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “রাজু অফিসে খুব একটা সময় দেন না। তার মূল কাজ ছিল ‘দরদাম ঠিক করা’। যে পদে যত টাকার ঘুষ, সেটা রাজু সরাসরি বলে দিত।
এই রাজুর নামে ঢাকায় ১৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর নামে ৩০টির বেশি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে—যা নিয়ে এখন প্রশাসনের অভ্যন্তরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
নিয়োগ বঞ্চিত প্রার্থীদের অভিযোগে বর্তমানে এলজিইডি ভবনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রতিদিনই নিয়োগ বঞ্চিত ও ভুক্তভোগী প্রার্থীরা প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর দপ্তরের সামনে ভিড় করছেন ঘুষের টাকা ফেরতের দাবিতে।
এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমার থেকে ৮ লাখ টাকা নিয়েছিল। এখন ফোন ধরছে না, অফিসে গেলে পোষা লোকজন হুমকি দেয়।”
আরেকজন জানান, “আমাকে দপ্তরে ডেকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। এই টাকা ফেরত না দিলে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব।
ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ শুধু নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়। সূত্র জানায়, অতি সম্প্রতি ২০১ কোটি টাকার গাড়ি ক্রয় টেন্ডারেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মঞ্জুর আলী মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে অদক্ষ একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। এখন ঘুষের টাকা ‘জায়েজ’ করতে দ্রুত কার্যাদেশ দেওয়ার তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
এছাড়া প্রকল্পে কনসালটেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘অ্যাকুয়া লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকেও ঘুষের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এখানে ৪৮ জন প্রার্থীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়ে সুপারিশপত্র পাঠানো হয় ঐ কোম্পানিতে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগের আর্থিক অঙ্কটি ভয়াবহ— ক্ষেত্র ঘুষের পরিমাণ (প্রতি জনে) প্রার্থীর সংখ্যা মোট ঘুষের অঙ্ক,সহকারী প্রকৌশলী ১০ লাখ টাকা ৮০ জন, ৮ কোটি টাকা
উপসহকারী প্রকৌশলী ৮ লাখটাকা, ১০০ জন ৮ কোটি টাকা,অন্যান্য পদ ৫ লাখ টাকা ৭০ জন ৩.৫ কোটি টাকা।
কনসালটেন্ট নিয়োগ (অ্যাকুয়া লিমিটেড) ৫ লাখ টাকা ৪৮ জন ২.৪ কোটি টাকা
মোট ≈ ২১.৯ কোটি টাকা
তথ্য বলছে, এই নিয়োগ ও কনসালটেন্ট প্রক্রিয়ায় ঘুষের অঙ্ক ২০ কোটির বেশি।
আইন বিশেষজ্ঞ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাক্তন এক কর্মকর্তা বলেন, “সরকারি প্রকল্পে আউটসোর্সিং নিয়োগের ক্ষেত্রে তদারকি দুর্বল থাকলে এই ধরনের সিন্ডিকেট সহজেই গড়ে ওঠে। প্রশ্ন উঠছে—এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক তদারকি কোথায় ছিল?”
তিনি আরও বলেন, “যদি এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু চাকরি থেকে অব্যাহতি নয়, ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে মামলা করারও সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দিনাজপুরের বাসিন্দা মঞ্জুর আলী নিজেকে বিএনপি নেতাদের ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে নিজ অবস্থান টিকিয়ে রেখেছেন। অভিযোগ আছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশও তিনি একাধিকবার অগ্রাহ্য করেছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্তে নামা হয়নি। একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, “অভিযোগের পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে, দুদকের জন্য এটি একটি টেস্ট কেস হয়ে উঠছে।
এদিকে এলজিইডির অভ্যন্তরেও উঠেছে জবাবদিহির দাবি। এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “পিআরএলে যাওয়ার আগে এই ধরনের বড় নিয়োগ দুর্নীতি অস্বাভাবিক। এটা একদিনে সম্ভব নয়, দীর্ঘদিনের একটি নেটওয়ার্ক এখানে কাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগ বঞ্চিত ভুক্তভোগীরা ঘুষের টাকা ফেরতের দাবিতে এখন উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দপ্তরে ধর্না দিচ্ছেন।
একজন নারী প্রার্থী বলেন, “আমার বাবার পেনশন ভেঙে ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। আজ আমরা চাকরিও পেলাম না, টাকা ফেরতও পাচ্ছি না।”
আরেকজন জানান, “ওরা আমাদের মতো দরিদ্রদের সঙ্গে ঠকেছে। আমরা চাই এই নিয়োগ বাতিল হোক, জড়িতদের বিচার হোক।”
বিশেষজ্ঞ মত - সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর একজন প্রতিনিধি বলেন, “এই ঘটনা প্রশাসনের দুর্বলতা ও দুর্নীতি সংস্কৃতির নগ্ন রূপ তুলে ধরেছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতি নয়, এটি একটি সাংগঠনিক অপরাধ। এখানে উদাহরণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অন্য কর্মকর্তারাও একই পথ অনুসরণ করবেন।
অভিযোগ উঠেছে ২৫০ জনকে নিয়োগের নামে ২০ কোটি টাকার বেশি ঘুষ নেওয়ার। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু প্রকৌশলী মঞ্জুর আলী ও তার ভাই রাজু। নিয়োগ বঞ্চিতদের কাছ থেকে পাওয়া ডজন ডজন লিখিত অভিযোগ।দুর্নীতি দমন কমিশন ও এলজিইডির নজরদারির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন। টেন্ডার ও কনসালটেন্ট নিয়োগেও ঘুষের অভিযোগ।ভুক্তভোগীদের আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে।
এই কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রকৌশলী মঞ্জুর আলী অবসরের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে এখন সবার নজর দুদক ও প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—
“২০ কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্যের পরও যদি কেউ দায়মুক্তি পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের বার্তা কী হবে?”