বিশেষ প্রতিবেদন |
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে ঝড়—গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে পদত্যাগের আলটিমেটাম, উঠছে নানা প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ।
বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্বল ৫ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত (মার্জার) করার ঘোষণা এবং তাদের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করার পরই শুরু হয় এই উত্তেজনা।
বিনিয়োগকারীদের দাবি—এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনবহির্ভূত নয়, এটি হাজারো ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারকে আর্থিক বিপর্যয়ে ফেলবে।
বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ, আমরা ঠকেছি, অথচ দায় নিচ্ছে না কেউ
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন,
“গভর্নর শেয়ার শূন্য ঘোষণার মাধ্যমে আমাদের বিনিয়োগের পুরো টাকাটা মুছে দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী তিনি তা করতে পারেন না।
একাধিক বিনিয়োগকারী জানান, গত কয়েক বছরে এসব ব্যাংকের শেয়ারে তাঁরা জীবনভর সঞ্চিত টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন।
এখন সেই শেয়ার কাগজের টুকরো হয়ে গেছে, বলেন এক ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারী,
গভর্নরের এই এক ঘোষণায় আমরা পথে বসেছি।
তথ্য বলছে, পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার,
যাদের মধ্যে অধিকাংশই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশি।
দুর্বল ৫ ব্যাংকের মার্জার সিদ্ধান্ত: কারা আড়ালে লাভবান?
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে,
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—
এই পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একত্রিত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করা হবে।
চলমান দুর্বলতা, মূলধনের ঘাটতি এবং অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে এটি জরুরি পদক্ষেপ বলেই দাবি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
তবে ব্যাংকিং খাতের একাধিক সূত্র জানায়,
এই মার্জার প্রক্রিয়া হয়েছে, হঠাৎ,
এবং পর্যাপ্ত পরামর্শ বা শেয়ারহোল্ডার সম্মতি ছাড়াই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে— কে বা কারা এই মার্জার প্রক্রিয়া থেকে প্রকৃত লাভবান হবে?
অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. মোতাহার হোসেন মনে করেন, একটি ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাকে প্রশাসক করা যেতে পারে, কিন্তু পাঁচটি ব্যাংক একসঙ্গে সরকার পরিচালিত কাঠামোয় নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
এতে ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট আরও বাড়তে পারে।
দুদকের প্রতিক্রিয়া: সিদ্ধান্তে অনিয়মের গন্ধ পেলে তদন্ত হবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আমরা বিষয়টি নজরে রেখেছি। যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিশেষ সুবিধা পায়,
অথবা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতির বিনিময়ে কোনো গোষ্ঠী লাভবান হয়—তাহলে দুদক অবশ্যই তদন্তে নামবে।
সূত্র জানায়, দুদক ইতিমধ্যে এসব ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ, শেয়ারমূল্যের ওঠানামা ও অভ্যন্তরীণ লেনদেন পর্যালোচনা শুরু করেছে।
দুদকের এক পরিচালক বলেন,
যে সিদ্ধান্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীর ক্ষতি ডেকে আনে, তা শুধু প্রশাসনিক নয়—নৈতিক প্রশ্নও তোলে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা: ব্যাংকগুলোর অবস্থা কতটা নাজুক? বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী,
এই পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত অনাদায়ী ঋণ (NPL) প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ঋণ ‘ক্লাসিফায়েড’—অর্থাৎ আদায়যোগ্য নয়।
তথ্য বলছে, একাধিক ব্যাংকের পরিচালক পরিবারভুক্ত ব্যক্তিদের কাছেই বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। এক্সিম ব্যাংকের এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক চাপ ও আত্মীয়-স্বজনকে ঋণ দেওয়া ছিল নিয়মিত বিষয়। এখন ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ায় দায় চাপানো হচ্ছে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের ওপর।
মার্জারের পরিণতি: গ্রাহকের আস্থা নাকি বিভ্রান্তি? গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, গ্রাহকসেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না, আমানত পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে।
ঢাকার মতিঝিল, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ব্যাংকগুলোর শাখায় দেখা গেছে আমানতকারীদের লাইন।
আমরা টাকাটা তুলব না, তা নয়, বলেন এক গ্রাহক, কিন্তু সরকার হঠাৎ সিদ্ধান্তে ভরসা কমে গেছে।
তথ্য বলছে, ঘোষণার পরদিন থেকেই এসব ব্যাংকের শাখায় গড়ে ৪০ শতাংশ বেশি উত্তোলন আবেদন জমা পড়েছে।
একই সঙ্গে চেক নিষ্পত্তি, রেমিট্যান্স ও নতুন আমানত খোলার হার ২৫ শতাংশ কমে গেছে।
শেয়ার শূন্য ঘোষণা: আইনি কাঠামো ও বিতর্ক,বিনিয়োগ আইনের ধারা অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করতে হলে,নির্দিষ্ট আর্থিক নিরীক্ষা ও শেয়ারহোল্ডার সম্মতির প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে।
সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, গভর্নর শেয়ার ভ্যালু জিরো ঘোষণা করতে পারেন,
কিন্তু তা করতে হলে স্পষ্ট নিরীক্ষা রিপোর্ট ও বোর্ডের অনুমোদন দরকার।
তা ছাড়া এটি বিনিয়োগ আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্তব্য করেন,
“অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করা ছাড়া বিকল্প ছিল না। তবে জনগণকে আগে জানানো উচিত ছিল।
অভিযোগ উঠছে: রাজনৈতিক প্রভাব ও গোপন সুবিধা? বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন—
মার্জারের ঘোষণার আগে থেকেই কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বিপুল শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।
তথ্য বলছে —ঘোষণার তিন দিন আগে একাধিক শরিয়াহ ব্যাংকের শেয়ার মূল্যে অস্বাভাবিক পতন দেখা গিয়েছিল।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন,
“আমরা লেনদেনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করছি। যদি অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁস বা ইনসাইড ট্রেডিং প্রমাণিত হয়,
তাহলে ফৌজদারি মামলা হতে পারে।
দুদকের দৃষ্টি ও সম্ভাব্য তদন্ত ক্ষেত্র
সূত্র জানায়, দুদক বিশেষ করে তিনটি বিষয় পর্যালোচনায় রেখেছে— মার্জার ঘোষণার আগে শেয়ার বিক্রি বা ক্রয়ের অস্বাভাবিকতা,কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি কি এই সিদ্ধান্তে লাভবান হয়েছেন? নিরীক্ষা রিপোর্ট ছাড়া শেয়ার শূন্য ঘোষণার বৈধতা
দুদকের উপপরিচালক (আর্থিক অনুসন্ধান) মো. রাশেদুল করিম বলেন,
আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের বৈধতা নয়, কিন্তু তার আর্থিক প্রভাব ও অনিয়ম আছে কি না—সেটি যাচাই করি। এই ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন উঠছে, যেগুলো আমাদের নজরে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: এটি কি সংকট নাকি সংস্কার? অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের মূলে আছে খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা,
কিন্তু পদ্ধতি ও যোগাযোগে বড় ব্যর্থতা হয়েছে।
একদিকে বিনিয়োগকারীদের ধাক্কা, অন্যদিকে ব্যাংকিং আস্থায় ঝুঁকি—এটা দ্বিমুখী সঙ্কট।
অন্যদিকে অর্থনীতি বিশ্লেষক ফারহানা চৌধুরী বলেন,
যে ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর রাজনৈতিক ছায়ায় ঋণ বিতরণ করেছে,
তাদের হঠাৎ একীভূত করে নতুন কাঠামো দাঁড় করানো মানে
মূল সমস্যাকে গোপন করা, সমাধান নয়।
প্রশ্ন উঠছে: কে নেবে এই দায়?
গভর্নর আহসান মনসুর বলেছেন,
শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না; ব্যাংকের দায় সরকার নেবে না।
কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন,
তাহলে এত বছরের বিনিয়োগের দায় কে নেবে?
এক প্রবাসী বিনিয়োগকারী বলেন,
“আমরা এই ব্যাংকগুলোকে বিশ্বাস করে টাকা পাঠিয়েছিলাম,
এখন সব হারিয়ে গেলেও কেউ দায় নিচ্ছে না। কোনো দেশে এরকম হয়?
স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার পরীক্ষা
সব তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট হচ্ছে—
এটি শুধুই আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নীতিগত দায়বদ্ধতার বড় পরীক্ষা।
তথ্য বলছে, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, রাজনীতিকরণ ও দুর্বল তদারকি বহুদিনের সমস্যা। এই মার্জার প্রক্রিয়া তা সমাধান করতে পারবে কি না,
নাকি নতুনভাবে আস্থার সংকট তৈরি করবে—তা সময়ই বলবে।
দুদক, বিএসইসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ তদন্তের দাবি উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন— জনগণের অর্থ নিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্তে আগে জনগণকে জানানোই সুশাসনের প্রথম শর্ত।
প্রশ্ন উঠছে— বাংলাদেশ ব্যাংক কি সেই স্বচ্ছতার পথেই হাঁটছে,
নাকি আবারও আড়ালের কোনো অর্থনৈতিক চাপে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?