বিশেষ প্রতিনিধি
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। শুধু এ টুকুর মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ না। দেশের একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ হিসেবে তার কর্মযজ্ঞ বিশাল এবং নানা শাখায় বিস্তৃত। দক্ষ প্রশাসক, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, লেখক, গবেষকসহ নানা শাখায় তাঁর সরব উপস্থিতি।
সরব উপস্থিতিই শুধু নয়- মেধার বিশালত্বের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। সব জায়গায় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়- যেটা তিনি পেরেছেন। এদিক থেকে তিনি অনেকের চেয়ে এগিয়ে। ড. সালেহউদ্দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যখন ছিলেন তখন দেশের ব্যাংকিং খাতকে নিজস্ব ভিত্তির উপর দাড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তার দূরদর্শিতার ফলে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছিল। তার কর্মদক্ষতা, মেধা, যোগ্যতাকে বিবেচনায় এনে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব দিয়েছেন প্রফেসর ড. ইউনূস। জুলাই বিপ্লবের সময় দেশে আর্থিক খাত যে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না দিলে হয়তো ভঙ্গুরই থেকে যেত।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্যাদের সঙ্গে ড.
সালেহউদ্দিন আহমেদ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ৯ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। সরকারের স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য কয়েকবার তার দপ্তর পরিবর্তন করা হয়। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৬ আগস্টই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান। আবার ২৭ আগস্ট তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। শুধু ড. সালেহউদ্দিন নয় অন্যদের বেলায়ও দপ্তর বন্টনের ঘটনা ঘটেছে। শেষতক তিনি অর্থ উপদেষ্টা।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখী হলে তিনি ব্যাংকিং খাতসহ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তিনি বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতি খুব একটা খারাপ অবস্থানে নেই। তবে আমরা চেষ্টা করবো অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতিকে খারাপ অবস্থান থেকে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে। তিনি তার চেষ্টা থেকে এক চুলও সরে যাননি। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তার দূরদর্শিতার জায়গা থেকে বিদেশি ঋণ গ্রহণের ব্যাপারে অধিক সচেতন। কঠিন শর্তে ঋণ নেওয়ার বিপক্ষে তিনি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের শুরু হওয়া বার্ষিক সভার দ্বিতীয় দিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, প্রতিশ্রুত ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফ যদি নতুন বা কঠিন কোনো শর্ত আরোপ করে তাহলে সরকার দ্বিতীয়বার ভাববে ঋণ নেবে কি না। বরং আমরা বিকল্প উৎস নিয়ে চিন্তা করব, কারণ আমাদের অর্থনীতি আগের থেকে অনেক স্থিতিশীল।
একই দিনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি মৃদু পুনরুদ্ধারের দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক রূপান্তর এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দুটি নতুন প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত হয়েছে, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। চলমান স্থিতিশীলতা ও সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আগামী বছরগুলোয় আরও ভালো হবে।
জীবন শুরু এবং শিক্ষা: সালেহউদ্দিন আহমেদ রাজধানী ঢাকার পুরান মাহুতটুলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার পৈত্রিক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৬৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৬৯ সালে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৪ সালে তার দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭৮ সালে কানাডার হ্যামিল্টন শহরে অবস্থিত ম্যাকমাস্টার
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন: ১৯৭০ সালে সালেহউদ্দিন ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রশাসনে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) ক্যাডারে যোগ দেন। তিনি ঢাকা জেলার সহকারী কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। পিরোজপুর জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অন হিউম্যান রিসোর্স ডেভলপমেন্টে কাজ করেন, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজের সাথে একীভূত হয়। এছাড়া তিনি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্র (সিরডাপ)-এর গবেষণাপ্রধান হিসেবে কাজ করেন।
তিনি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড)-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর
মহাপরিচালক ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তিনি ১৯৯৮ সালে ব্র্যাকে ডেপুটি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।
সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০০৫ সালের ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। এ পদে ছিলেন ২০০৯ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। গভর্নরের পদ থেকে অবসরের পর ২০০৯ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। ২০১৪ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ট্রাস্টি। ২০২০ সালে সালেহউদ্দিন আসা ইন্টারন্যাশনালে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন।
তিনি অমুনাফাভোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাকশনের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি এনজিও ফোরামের সাধারণ কমিটির সদস্য। তিনি টেলিযোগাযোগ নেটওযার্ক সেবা প্রদানকারী কোম্পানি গ্রামীণফোনের স্বাধীন পরিচালক। তিনি সাউথইস্ট
ইউনিভার্সিটির সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়ন্সেসের উপদেষ্টা।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যেমন সফলতা দেখিয়েছেন এখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়ে ঠিক সেরকম সফলতাই দেখিয়ে চলছেন।
অনেক উপদেষ্টার নামে আর্থিক অনিয়ম এবং আখের গোছানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ আছে বিদেশে অর্থ পাচারেরও। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো মহল থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ ওঠেনি। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নয় প্রশাসনের অন্য যেসব জায়গায় ছিলেন সেখানেও তার সফলতা ছিল। কোনো ধরনের দুর্নাম তাকে কাধে নিতে হয়নি।