জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে নতুন কেলেঙ্কারি: সরকারি অর্থ ‘ডিসকাউন্টে’ আত্মসাৎ
স্টাফ রিপোর্টার |
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) বহু বছর ধরেই অনিয়ম, জালিয়াতি, ঘুষ ও ভোগান্তির জন্য আলোচনায়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এবার যুক্ত হয়েছে নতুন এক ‘অদৃশ্য রাজস্ব খেলা’।
তথ্য বলছে, এখন আর শুধু ঘুষ বা হয়রানি নয়— সরকার নির্ধারিত ফি, বিলম্ব জরিমানা ও প্লটের মূল্যে অবৈধ ছাড় দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একদল প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
পুরনো দুর্নীতির নতুন মোড়
জাগৃকের দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই ফ্ল্যাট ও প্লট বরাদ্দ নিয়ে ঘুষ লেনদেন, ফাইল গায়েব, ও ফরমাল অনুমোদনে কারচুপি চলে আসছে।
কিন্তু সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে যেটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক, তা হলো— সরকার নির্ধারিত বিধি-বিধান অনুযায়ী প্লটের মূল্য কমিয়ে রাজস্ব আত্মসাৎ করা।
পূর্বে কেউই এতটা প্রকাশ্যভাবে অর্থ লোপাটের সাহস দেখাননি। এখন দেখা যাচ্ছে, বিধিবহির্ভূত ছাড় দিয়ে কোটি টাকার ক্ষতি ঘটিয়ে দিচ্ছেন কর্মকর্তারা, আর সেই অর্থ ভাগাভাগি হচ্ছে ‘অভ্যন্তরীণ বৃত্তে’।
চট্টগ্রামের সেলিনা সুলতানার প্লট: ২ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রশ্ন
চট্টগ্রামের হালিশহর হাউজিং এস্টেটের ‘এ’ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ২৯ নম্বর প্লটের ঘটনা জাগৃকের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারির বড় উদাহরণ।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেলিনা সুলতানা নামের এক প্রাপককে একাধিকবার— মোট তিন দফায়— খণ্ড জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। যা বরাদ্দ নির্দেশিকার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বিধি অনুযায়ী, একই ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার খণ্ড জমি বরাদ্দ দিলে জমির মূল্য প্রচলিত মূল্যের তিন গুণ হারে আদায় করতে হয়।
কিন্তু তথ্য বলছে, এখানে আদায় করা হয়েছে মাত্র ২৬ লাখ টাকার মতো— যেখানে সরকারের পাওনা ছিল প্রায় ৩ কোটি টাকা।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একজন সদস্য সভায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিলেও চেয়ারম্যান সৈয়দ নুরুল বাসির সেটি উপেক্ষা করেন। বরং সিদ্ধান্ত নেন কম মূল্যে বরাদ্দের।
সূত্র জানায়, এই ঘটনায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৭৩ লাখ ৮২ হাজার ৯৬২ টাকা। অর্থের এই অংশ পরবর্তীতে “ভাগ-বাটোয়ারা” হয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মধ্যে।
এই ঘটনায় জড়িত ছিলেন তখনকার চেয়ারম্যান সৈয়দ নুরুল বাসির, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কাজী আতিয়ুর রহমান, ও সদস্য (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) এস এম সোহরাব হোসেন।
অভিযোগ উঠছে— এদের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি বর্তমান কর্তৃপক্ষ।
মিরপুরের ১৭৩ বাণিজ্যিক প্লট: কাগজে কারচুপি, চালানে রহস্য
আরেকটি নথি বলছে, মিরপুর সেকশন-১০ এর ব্লক-বি তে ১৭৩ নং বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দের বকেয়া আদায়ে একই ধরণের অসঙ্গতি রয়েছে।
এখানে শাহজাহান মিয়া নামের একজন প্রাপক ৩০ কাঠা জমির জন্য চালান পরিশোধ করেন ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, অথচ হিসাব অনুযায়ী আদায় করার কথা ছিল ৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বেশি।
প্রশ্ন উঠছে, ৯৯ লাখ টাকার এই ঘাটতি গেল কোথায়?
তথ্য বলছে, প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের তৎকালীন পরিচালক আলমগীর হুছাইন নিয়মবহির্ভূতভাবে ২১ শতাংশ বিলম্ব ফি কমিয়ে ১৬ শতাংশে নামিয়ে দেন।
বাড়তি ৭৫ হাজার টাকার হিসাবও তিনি কখনো দেখাতে পারেননি।
এই অনিয়ম ধরা পড়লে উপপরিচালক (অর্থ ও হিসাব) গুলরুখ খাদিজা জাহান নথিতে স্বাক্ষর না করে ফেরত পাঠান।
কিন্তু পরে সূত্র জানায়, দুর্নীতিবাজচক্র জোরপূর্বক উপপরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) মো. মুশফিকুল ইসলামকে দিয়ে অবৈধভাবে সেই নথিতে স্বাক্ষর করায়— যা প্রশাসনিকভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি।
রূপনগরের বিকল্প প্লট কেলেঙ্কারি
মিরপুর রূপনগর সরকারি হাউজিং এস্টেটের বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দেও দেখা যায় একই কৌশল।
৬০ ফুট প্রশস্ত সড়কসংলগ্ন জমি ২৫ লাখ টাকা প্রতি কাঠা হিসেবে নির্ধারিত হলেও বোর্ড সভায় চালান পাস করা হয় মাত্র ২ কোটি ৪০ লাখ টাকায়।
তথ্য বলছে, প্রকৃত মূল্য হওয়ার কথা ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি।
চালান প্রস্তুত করেন হিসাবরক্ষক শাহাব উদ্দিন, পাস করেন সহকারী পরিচালক (অর্থ) মামুনুর রশীদ।
পরবর্তীতে ২৬৮তম বোর্ড সভায় আইন কর্মকর্তার মতামত নিতে বলা হলেও তা হয় চালান পাসের এক মাস পর— যা বিধি অনুযায়ী অবৈধ।
প্রশ্ন উঠছে, যদি আইনি মতামত আগেই না নেওয়া হয়, তাহলে কীভাবে এমন বিপুল অর্থ ছাড় হলো?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি “পরিকল্পিত প্রশাসনিক কারচুপি”, যেখানে প্রথমে অবৈধ অনুমোদন দিয়ে পরে আইনি আবরণ তৈরি করা হয়।
অভ্যন্তরীণ বৃত্ত: আলমগীর হুছাইন সিন্ডিকেট
জাগৃকের অর্থ আত্মসাতের এই ধারাবাহিক দুর্নীতির অন্যতম হোতা হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) আলমগীর হুছাইনের নাম, যিনি বর্তমানে সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) পদে উন্নীত হয়েছেন।
সূত্র জানায়, আলমগীরের ঘনিষ্ঠ মহল ও অর্থ শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে গড়ে তুলেছেন “আভ্যন্তরীণ কমিশন চক্র”, যারা চালান প্রক্রিয়ায় শতকোটি টাকার অনিয়মে জড়িত।
নথি বলছে, একাধিক প্লটের চালান সংশোধন ও বিলম্ব ফি পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা নিয়মিত রাজস্বে ঘাটতি সৃষ্টি করছেন।
একজন সাবেক অডিট কর্মকর্তা বলেন—এটি শুধু ঘুষ নয়, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের শৃঙ্খলিত পদ্ধতি। প্রাথমিকভাবে চালান কমিয়ে পরে নথি সাজানো হয় যেন সব কিছু বৈধ মনে হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা: ‘দালাল ছাড়া কিছুই হয় না’
জাগৃকের একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, আবেদন করার পর নিয়মিত ফাইল হারানো, পুনরায় ফি দাবি, বা ‘অফিসে ঘুরে মরার’ অভিজ্ঞতা তাদের কাছে নিত্যদিনের ব্যাপার।
একজন বরাদ্দপ্রত্যাশী বলেন—
“যদি দালালের হাতে না যাই, কেউ ফাইল তুলেই দেখে না। নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধ করলেও নানা অজুহাতে ঘুষ দিতে হয়।”
তাদের অভিযোগ, একই অফিসে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা-ব্রোকার মিলে একটি “অভ্যন্তরীণ লাইন” তৈরি করেছেন। কেউ ফাঁদে না পড়লে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: ‘প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতি’
গণপূর্ত খাতের একজন সাবেক সচিব বলেন—
“জাগৃকে যে অনিয়মগুলো হচ্ছে, তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক। বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতে অসংখ্যবার ‘বিধি অনুযায়ী মূল্য আদায় হয়নি’ লেখা আছে, কিন্তু তাতে কোনো পরিণাম হয় না।”
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক পরিচালক মনে করেন, এখানে স্পষ্ট দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ছায়া রয়েছে—
“যদি এক বোর্ড সদস্যের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উপেক্ষা করা যায়, তবে বোর্ডের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।”
সরকারি ক্ষতির হিসাব ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
নথি ও কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দেখা গেছে, শুধুমাত্র চট্টগ্রাম, মিরপুর ও রূপনগর এলাকার তিনটি ঘটনার কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকারও বেশি।
তবে এটাই শুধু দৃশ্যমান অংশ— আরও ডজনখানেক প্লটের ক্ষেত্রে একই ধরনের ছাড়ের অভিযোগ আছে।
প্রশ্ন উঠছে, এত বড় আর্থিক ক্ষতির পরও কেন কোনো প্রশাসনিক তদন্ত হয়নি?
জাগৃকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“উর্ধ্বতন মহলের মৌন সম্মতি ছাড়া এমন ছাড় সম্ভব নয়। কিছু নথি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘অডিট এড়ানোর’ জন্য সময়ক্ষেপণ করা হয়।”
আইনি বিশ্লেষণ: রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাত নাকি প্রশাসনিক ত্রুটি?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় রাজস্বে ইচ্ছাকৃত ক্ষতি ঘটানো দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় অপরাধ হিসেবে গণ্য, যা সরকারি কর্মচারীর ট্রাস্ট ভঙ্গের সমতুল্য।
তবে প্রমাণের জটিলতা ও প্রশাসনিক সুরক্ষার কারণে এসব মামলা সচরাচর অগ্রসর হয় না।
একজন সিনিয়র আইনজীবী মন্তব্য করেন—
“যদি বোর্ড অনুমোদনের পর রাজস্বে টাকা কম জমা হয়, সেটি কেবল ‘ত্রুটি’ নয়; তা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সচরাচর এসব ফাইলে ‘প্রশাসনিক বিভ্রাট’ লিখে দায়মুক্তি দেওয়া হয়।”
চেয়ারম্যান ফেরদৌসীর ভূমিকা: ‘ছাড় নয়, নজরদারি বাড়ানো দরকার’
বর্তমান চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম বোর্ড সভায় চালান অনুমোদনের অনিয়ম লক্ষ্য করে আইন মতামত চাইলেও পরে আর কোনো ব্যবস্থা নেননি।
সূত্র জানায়, তিনি অভ্যন্তরীণ চাপে বিষয়টি “আন্তরিকভাবে” তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সংস্কারের দাবি ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ দেশের নগর পরিকল্পনা ও আবাসন খাতের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তথ্য বলছে, এর অভ্যন্তরে এখন চলছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক ঘূর্ণিঝড়।
জমির ন্যায্যমূল্য না আদায়, রাজস্ব আত্মসাৎ, ফাইল কারচুপি, ও সিন্ডিকেটভিত্তিক ঘুষ— সব মিলিয়ে এই প্রতিষ্ঠান তার আস্থার জায়গা হারাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি যারা ঘটাচ্ছে, তাদের জবাবদিহি করবে কে?
দুদক, অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা হাউজিং মন্ত্রণালয়— কেউই এখনো প্রকাশ্যে কোনো তদন্ত ঘোষণা করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
“যদি এই সিন্ডিকেট ভাঙা না যায়, তবে শহর গড়ার দায়িত্বে থাকা সংস্থাই হয়ে উঠবে দুর্নীতির আশ্রয়স্থল।