ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড—ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড—এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর পরও তা শেষ না হওয়ায় তদন্তের গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তথ্য বলছে, অভিযোগ অনুযায়ী আব্দুর রাজ্জাক জমি, বাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিপুল অর্থবৈভবের মালিক হয়েছেন। একই সঙ্গে নিজ এলাকায় মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে স্থানীয়ভাবে ‘দানবীর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে—একজন সরকারি প্রকৌশলীর আয় দিয়ে এই বিপুল সম্পদের উৎস কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
দুদকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগ পাওয়ার পর ৭ মে অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি।
অনুসন্ধানে দুদকের উপপরিচালক নাজমুল হাসান এবং উপসহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান-এর নেতৃত্বে একটি দল কাজ করছে।তবে সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করা সম্ভব হয়নি এবং তদন্ত কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে।চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুদক আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসীর নামে থাকা স্থাবর সম্পদের তথ্য জানতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-এর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয়।চিঠিতে ৫ মার্চের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়।
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একাধিকবার তলবি নোটিস পাঠানো হয়েছে, কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। তিনি আরও বলেন, রেকর্ডপত্র সংগ্রহ শেষে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বর্তমানে তিনি ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়ের উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন।দুদক বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো অনুসন্ধান ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা, প্রয়োজনে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় বাড়ানো যায়। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৭৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এই অনুসন্ধান এক বছরেও শেষ হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে—কেন নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করেও তদন্ত শেষ করা যাচ্ছে না?
অভিযোগে বলা হয়েছে, আব্দুর রাজ্জাকের গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হাসলিগাঁও গ্রামে। সেখানে প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর দোতলা বাড়ি, দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা নির্মাণ করেছেন তিনি।
এছাড়া স্থানীয় বাজারে বহুতল ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং মাছের খামারের তথ্য উঠে এসেছে অভিযোগে।
তথ্য বলছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকায় তার দুটি বহুতল ভবন রয়েছে। গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও সম্পদের তথ্য রয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী, সাভারের ভাকুর্তা এলাকায় ‘ওশাকা পাওয়ার লিমিটেড’ নামে বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন সরঞ্জাম তৈরির একটি কারখানা গড়ে তুলেছেন তিনি।সূত্র জানায়, উচ্চচাপ বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে গ্রাহকদের তার প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম নিতে বাধ্য করা হতো—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, যারা তা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তারা প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়তেন।তথ্য বলছে, তার প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ট্রান্সফরমারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৬ সালে একটি প্রকল্পে সরবরাহ করা ৩০০ ট্রান্সফরমারের মধ্যে ১৯১টিকে মানহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী, এসব নিম্নমানের সরঞ্জামের কারণে বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে।
তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।অভিযোগে আরও বলা হয়, আব্দুর রাজ্জাক ডিপিডিসির বদলি, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন।তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে তার প্রভাব ছিল—এমন দাবি করা হয়েছে।এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকৌশলীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
২০২২ সালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ডিপিডিসি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।কমিটির প্রধান ছিলেন প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামাল।
তথ্য বলছে, অভিযুক্ত আটজনের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির প্রধান পরবর্তীতে প্রশাসনিকভাবে বঞ্চনার শিকার হন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজধানীর পান্থপথে করপোরেট অফিস স্থাপন করে তিনি ‘ওশাকা পাওয়ার লিমিটেড’সহ অন্যান্য ব্যবসা পরিচালনা করেছেন।তার পরিবারের সদস্যরাও এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া কিছু সম্পদ বিক্রি করে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে, যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
একজন সুশাসন বিশ্লেষক বলেন,
“অনুসন্ধান দীর্ঘায়িত হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
দুদকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অনুসন্ধান এখনো চলমান এবং সব তথ্য যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে না।
প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই অনুসন্ধান কবে শেষ হবে এবং অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রমাণিত হবে?
তথ্য, অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট—আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুতর এবং বহুমাত্রিক।
তবে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবে তদন্ত। অনুসন্ধান শেষ হলে এই অভিযোগগুলোর বাস্তবতা, দায় এবং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।