বিআইডব্লিউটিএ কালো টাকার সাম্রাজ্যে প্রকৌশলী আইয়ুব আলী
ইসলাম সবুজ :
কালো টাকা সাদা করার সব ধরনের সুযোগ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুবিধা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাতিল করেছিল। তারপরও এখনো কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তাদের মধ্যে একজন কালো টাকা সাদা করার কৌশলের শীর্ষে বিআইডব্লিউটিএ এর অতিরক্ত প্রধান প্রকৌশলী আইয়ুব আলী।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ
(বিআইডব্লিউটিএ)-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও একাধিক প্রকল্পের পরিচালক মো. আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সম্পদ অর্জন, স্বজনপ্রীতি এবং প্রকল্প অর্থায়নে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে সুশীল সমাজ ও নৌ পরিবহন অধিদপ্তর ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্বে থেকে গত এক দশকে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে গড়ে উঠেছে বিপুল সম্পদ-যার প্রকৃত উৎস নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা সমালোচনা ও গুঞ্জন। অনুসন্ধান বলছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইয়ুব আলী ও তার স্ত্রী আত্মীয়দের নামে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামারবাড়ি এবং বায়োগ্যাস প্রকল্প। সরকারের কাছে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণে আইয়ুব আলী যেভাবে অল্প মূল্য উল্লেখ দেখিয়েছেন। অনুসন্ধানে সেই সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য দশগুণ বা তারও বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আইয়ুব আলীর ঢাকাসহ ফতুল্লা, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, পূর্বাচল, কালীগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, শালিখা, ভৈরব, বাঘারপাড়ায়ও জমি কিনেছেন। এসব জমি তিনি ছেলে নাভিদ ফারহান ঐশিক, স্ত্রী ফারজানা নাহিদ লিজা, মেয়ে পূর্ণতা ফারজানা, ভাই ওলিয়ার রহমান মোল্লা, মোশারফ হোসেন মোল্লা, ইউনুস মোল্লা ও একমাত্র বোন হালিমা বেগমের নামে কিনেছেন বলে উঠেএসেছে। আইয়ুব আলীর কিছু দুর্নীতির সংখ্যা তুলে ধরা হলো।
সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার রায়েরবাজারে ফ্ল্যাট #৭৭, হাউজ #৭৯৫ এ/১-সরকারকে দেখানো হয়েছে মাত্র ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্য, অথচ স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী এর মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা। রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জে ৩ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অনুসন্ধান বলছে স্থানীয়দের মতে, ঐ এলাকায় এক কাঠা জমির দামই ১ কোটির বেশি।
কেরানীগঞ্জে স্ত্রীর নামে ৪ কাঠা জমি হেবা দলিল দেখিয়ে অর্জিত হলেও সেটি পরবর্তীতে মাত্র ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় বিক্রি দেখানো হয়েছে-যা বাজারমূল্যের তুলনায় অতি অস্বাভাবিক। প্রশ্ন উঠছে, একজন সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী কোথায় পেলেন এত মূল্যবান জমি? ঢাকা কাফরুল, ইব্রাহিমপুরে ২৯ শতক জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৭ লক্ষ্য ৩৬ হাজার টাকা, অথচ জমি ব্যবসায়ীরা বলছেন প্রতি কাঠা ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার নিচে নয়। পল্লবী এলাকায় ১৯.৪৭.৯৮৮-শতক জমি ৪৩ জনের মধ্যে ভাগাভাগি হলেও সরকারকে দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এক ডেভেলপার বলেন, এই দামে জমি পাওয়া অসম্ভব-মূল্য গোপন করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, আইয়ুব আলী কালো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে তার ছেলেদের কাছে পাঠান। পরে সেই অর্থ রেমিটেন্স দেখিয়ে ফেরত আনা হয়, তৈরি করেন মানি রিসিট হয়ে যায় কালো টাকা সাদা। অভিযোগ রয়েছে এভাবে প্রতিবছর আইয়ুব আলী তার স্ত্রী এবং পুত্রবধূর নামে প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বেশি ফেরত এসেছে বলে একাধিক ব্যাংক লেনদেন নথি থেকে উঠে আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অফিস সহকারী জানান, স্যারের এক উকিল বন্ধু বলেছেন, তার স্ত্রী ফারজানার গহনার পরিমাণ ২০০ ভরির বেশি। কিন্তু স্যার কৌশলে সরকারকে দেখিয়েছে ৭৫ ভরি। পাশাপাশি আরেকটি কাজ করেছে ব্যাংক হিসাব জালিয়াতি, SIBL Bank:১৫৫,৭৫৩.০২ টাকা।
Pubali bank: ৪৯,৭৭৫.০২ টাকা। দুই ব্যাংকে অল্প অল্প টাকা রেখে দেন-যাতে দুর্নীতি দমন (দুদক) এর নজরে না আসে।
অনুসন্ধান সূত্র বলছে আইয়ুব আলীর মাসিক খরচ দেখিয়েছে ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, অথচ সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে বাৎসরিক খরচ ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। আর তিনি নগদ অর্থ দেখিয়েছে ৬১ লাখ টাকা মত। অথচ প্রেক্ষাপট বলছে তার হাতে সব সময় কোটি টাকা থাকে। তার এক সহকর্মী জানান, আইয়ুব আলী তো শত শত কোটি টাকার মালিক। অথচ তিনি ডিপিএসএ দেখিয়েছেন ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তার সঞ্চয়পত্রে রয়েছে কোটি কোটি টাকা, অথচ সরকারকে দেখিয়েছে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বাকি টাকা তিনি লুকিয়ে রেখেছেন। আরও জানা যায়, ব্যাংক থেকে ৭ লাখ এবং অফিস থেকে ১১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন আইয়ুব আলী, যা অনেকের মতে লোক দেখানো। প্রশ্ন উঠছে সরকারি প্রকল্পের অর্থ থেকে কীভাবে এত বিপুল সম্পদ? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইয়ুব আলী যেসব প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, সেগুলোর বেশ কয়েকটিতে রয়েছে মূল্য ফাঁকি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকার আশুগঞ্জে ২১০ কোটি টাকার কার্গো টার্মিনাল প্রকল্পে তার ঘনিষ্ঠ এক স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা মিলেছে। সেই জনপ্রতিনিধির জমিতে বর্তমানে চলছে মুরগি খামার, ভবন নির্মাণ ও বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণ। এক কর্মকর্তা জানান, বিআইডব্লিউটিপি-১ এবং ড্রেজিং প্রকল্পের ব্যয়ও অস্বাভাবিক। প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণের জন্য বিল করা হয়েছে বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় অনুমোদিত বিলের পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা, যার বড় একটি অংশ লোপাট হয়েছে বলে সন্দেহ। তথ্য বলছে, আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার পর প্রতিশ্রুতি না রাখায় একাধিক ঠিকাদার ক্ষুব্ধ হন। এমন এক ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নিয়েছিলেন। পরে কাজটি তার নিজ পছন্দের ঠিকাদারকে কাজটি দিয়ে দিলে উত্তেজনা ছড়ায়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি ওনার দায় নিতে পারবো না। অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অস্বাভাবিক সম্পদের ভিত্তিতে তদন্ত চালানো কঠিন নয়। ব্যাংক হিসাব, ভূমির দলিল ও আয়কর রিটার্ন মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একজন সাবেক পরিচালক বলেন, দুদক চাইলে স্বপ্রণোদিত হয়ে নোটিশ দিতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, ইচ্ছা কতটা আছে?