অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Nov 10, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ওয়াসা এমডি পদের জন্য কোটি টাকার দর-কষাকষি

নিজস্ব প্রতিবেদন 


শর্ত বদল, তড়িঘড়ি পদোন্নতি, সাক্ষাৎকার বাদ দিয়ে শর্টলিস্ট—সবই কি এক ব্যক্তিকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য? দুর্নীতির অভিযোগে সংযুক্ত থাকা সালাম কীভাবে ঢাকা ওয়াসার এমডি দৌড়ের শীর্ষে

নিজস্ব প্রতিবেদন
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। সরকারের কৌশলগত এই সংস্থায় এমডি বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন: কার ক্ষমতার জোরে, কার স্বার্থে, আর কার টাকার বিনিময়ে নিয়ম পাল্টানো হলো? এবং কেন দুর্নীতির অভিযোগে চার বছরের বেশি সময় সংযুক্ত থাকা আব্দুস সালাম ব্যাপারীকে তালিকার শীর্ষে তুলে আনতে এমন অস্বচ্ছ তৎপরতা দেখা গেল?

বয়স–গ্রেড শর্ত বদলে সালামের জন্য ‘পথ পরিষ্কার’
২১ মার্চ প্রকাশিত প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে বলা ছিল, আবেদনকারীকে অবশ্যই ন্যূনতম তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা হতে হবে। সালাম তখন ছিলেন চতুর্থ গ্রেডে। অর্থাৎ নিয়ম অনুযায়ী তিনি আবেদন করার যোগ্যই ছিলেন না।

কিন্তু মাত্র তিন দিনের মাথায় ২৩ মার্চ সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি আসে। সেখানে বয়স শিথিলের সুযোগ বাদ দেওয়া হয়। পরে কয়েক মাসের মধ্যে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে সালামকে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত করা হয় এবং চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। ওয়াসার ভেতরের কর্মকর্তাদের ভাষায়, “এই ধাপগুলো একটাই উদ্দেশ্যেই সামঞ্জস্য করা হয়েছিল।

অভিযোগ: এমডি পদের জন্য কোটি টাকার দর-কষাকষি

ওয়াসা অভ্যন্তরীণ একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এমডি পদ ঘিরে চলছে নজিরবিহীন আর্থিক দর-কষাকষি। অভিযোগ আছে, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আব্দুস সালাম ব্যাপারী স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ মহলে পদটি পেতে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অফার করেছেন। পাল্টা দর হিসেবে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শওকত মাহমুদ নাকি ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত অফার দিয়েছেন। এই গুঞ্জনে প্রতিষ্ঠানজুড়ে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সূত্র বলছে, ঠিক এই অস্বাভাবিক দর-কষাকষির সময়ই দ্রুত শর্ত পরিবর্তন ও সালামের পদোন্নতির ঘটনাগুলো ঘটে।

১৫ জুলাই দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর পিএইচডিধারী সাবেক সেনা কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীসহ মোট ৩৭ জন আবেদন করেন। বিজ্ঞপ্তিতে সাক্ষাৎকারের কথা থাকলেও প্রার্থীদের কাউকে ডাকা হয়নি।

পরিবর্তে, ওয়াসার ‘কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি’ সরাসরি তিনজনের তালিকা তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেখানে শীর্ষে রাখা হয় আব্দুস সালামকে। এই তালিকা পরে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পৌঁছায়।

ওয়াসা কর্মকর্তাদের বড় অংশ বলছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য সাক্ষাৎকার বাদ দেওয়ার মতো ঘটনাই প্রমাণ করে, সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।

ওয়াসার অন্তত দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সালাম ব্যাপারী দুর্নীতির অভিযোগে চার বছরের বেশি সময় সংযুক্ত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। সরকারের পরিবর্তনের পর প্রভাব খাটিয়ে তিনি মামলাটি প্রত্যাহার করান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুললেন,
“যিনি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন, তাঁকে কীভাবে এমডির মতো কৌশলগত পদে শীর্ষে তোলা হলো?”

সালামের দাবি: ‘এমন অভিজ্ঞ কেউ নেই’

নিজেকে ‘অপরিহার্য ব্যক্তি’ হিসেবে তুলে ধরে সালাম বলেন, ঢাকা ওয়াসার কাজে আমার মতো অভিজ্ঞ প্রকৌশলী নেই। আমাকে বাদ দিলে কেউ কাজ চালাতে পারবে না।”
এই বক্তব্য ওয়াসার ভেতরে আরও ক্ষোভ তৈরি করেছে।

আইন অনুযায়ী এমডি নিয়োগের ক্ষমতা ওয়াসা বোর্ডের হলেও গত বছরের ২৪ অক্টোবর বিশেষ অধ্যাদেশে বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়। নিয়োগ ক্ষমতা দেওয়া হয় সরকারের অধীন নতুন ‘কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি’র হাতে।

কমিটির আহ্বায়ক স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান। অন্য সদস্যরা জনপ্রশাসন, পানি সম্পদ, অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা।

অভিযোগ আছে, বোর্ড ভেঙে দিয়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল নির্দিষ্ট পছন্দের ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। কমিটির কেউই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

এমডি পদে তিন বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ স্থগিত চেয়ে রিট হলে ৩ নভেম্বর হাইকোর্ট বিজ্ঞপ্তি স্থগিত করেন। রুল জারি করেন। মামলাটি নিয়ে সুশাসন–বিষয়ক সংগঠনগুলো বলছে, “ঢাকা ওয়াসা এখন পরীক্ষা দিচ্ছে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে কি না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া যদি পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর প্রতিযোগিতায় নেমে আসে, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির গর্ত হয়ে উঠবে। সরকারকে এখনই প্রক্রিয়াটি বাতিল করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

শর্ত বদল, পদোন্নতি, সাক্ষাৎকার ছাড়া তালিকা, পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগ—সবই কি শুধু একজনকে এমডি পদে বসানোর জন্য?
গণমাধ্যমকর্মীদেরও প্রশ্ন,
“কোন অদৃশ্য শক্তি সালামকে এত দ্রুত সামনে নিয়ে এল?

ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগ নিয়ে যে অস্বচ্ছতার শুরু হয়েছে, তা এখন প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জনআস্থার বড় পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোংলায় কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর অভিযানে দুই মাদক ব্য

1

গণপূর্তে প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: প্

2

রাজধানীর রাস্তায় দিনের আলোয় গুলি, তারপর অগ্নিসংযোগ

3

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে শীর্ষ পদে নিরঙ্কুশ জয়

4

বিবাহিত, ফেসবুকে প্রমাণ করার কিছু নেই : অপু বিশ্বাস

5

আইবিএস সিস্টেমে সরকারি চাকুরীজীবীদের আয়কর কর্তনের নির্দেশ

6

আমি চুয়েটের শিক্ষার্থী, তাই আবেগ ও দায়বদ্ধতাও বেশি : চুয়েটের

7

এস আলমের পিএস থেকে ডিএমডি হওয়া আকিজ উদ্দিন

8

হরমুজ প্রণালিতে এক দিনে তিন পণ্যবাহী জাহাজে হামলা

9

ঢাকা আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গী বাজার পর্যন্ত সড়কের বেহাল দশা

10

নীলফামারী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল: উন্নয়নের নামে দুর্নীতি

11

নিলাম বনাম নাগরিক: ঢাকার আবাসন খাতে প্রতারণার ছায়া

12

‘স্বৈরাচারী মনোভাব এখন রাজনীতিতেও ঢুকে গেছে’ — আমীর খসরু

13

মান্দায় ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে বিদায়ী ওসি মনসুর রহমান

14

কুশারিয়া ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৫: টিম সাগরের বিজয় উল্লাস

15

অপরাধীদের কোন ছাড় দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

16

চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উম্মোচন করছে আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি

17

বাগেরহাট অফিসার্স ফোরামের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত

18

রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য লন্ডনে যাচ্ছেন শনিবার

19

উপদেষ্টা পদ ছাড়লেও ছাড়েননি সরকারি বাসভবন

20