তথ্য বলছে, তদন্তে খুরশীদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি
সোমবার সকালে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে আফনান জান্নাত কেয়াকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। জেরার জবাবে দুদক কর্মকর্তা কেয়া বলেন, তদন্তের সময় আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দফতরের ২১ জন কর্মকর্তার ১৬১ ধারায় জবানবন্দি নিয়েছি। তবে তাদের কেউই খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ করেননি। তাছাড়া, তদন্তে দেখা গেছে, তিনি প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে কোনো লাভবানও হননি।
সূত্র জানায়, দুদকের অভ্যন্তরে মতবিরোধ
তদন্ত কর্মকর্তার এই বক্তব্যের পর দুদকের আইনজীবী পক্ষে দেখা দেয় স্পষ্ট অস্বস্তি। আদালত সূত্র জানায়, দুদকের একাধিক আইনজীবী দাবি করেন—নথিগতভাবে খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ রয়েছে। এমন বক্তব্যের মধ্যে দুদকের অভ্যন্তরীণ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সূত্র জানায়, মামলাটি নিয়ে কমিশনের ভেতরেই বিভক্তি তৈরি হয়েছে—একপক্ষ মনে করছে, মামলাটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, অন্যপক্ষ বলছে, আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে, এখন আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
প্রশ্ন উঠছে: রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই যখন আদালতে অভিযোগ অস্বীকার করেন, তখন মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাবেক জেলা জজ ও আইন বিশ্লেষক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, দুদকের মামলাগুলোর নথি প্রস্তুত ও তদন্ত প্রক্রিয়া অনেক সময় প্রশাসনিক চাপ বা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত হয়। যদি তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে স্বীকার করেন যে প্রমাণ মেলেনি, তাহলে আদালতকে এখন নিরপেক্ষভাবে বিচার করে দেখতে হবে মামলার ভিত্তি কতটা শক্ত।
তথ্য বলছে, দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলে থাকা মামলা দুদকের এই মামলাটি দায়ের হয়েছিল এক দশকেরও বেশি আগে—পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার ও অযৌক্তিক প্লট বরাদ্দ’-এর অভিযোগে। নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের ৩০ কাঠা জমি বরাদ্দ নিয়ে ২০০৭ সালে অভিযোগ ওঠে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। মামলায় তার দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ মোট ৪৭ জনকে আসামি করা হয়।
দুদকের তথ্য বলছে, প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ১ হাজার ২০০ একর জমি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্লট বরাদ্দে নীতিমালা লঙ্ঘন, প্রভাব বিস্তার ও আত্মীয়স্বজনদের সুবিধা দেয়ার অভিযোগই মামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
সূত্র জানায়,একাধিক দুদক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মামলাটি তদন্তের সময় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ ছিল প্রবল। একজন কর্মকর্তা বলেন, তদন্তের কিছু অংশ এমনভাবে পরিচালিত হয়েছিল যে, কিছু নাম যোগ করতেই হবে—যদিও প্রমাণ অপ্রতুল। এই স্বীকারোক্তি মামলাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আমরা ন্যায়বিচার চাই’
পূর্বাচল প্রকল্পে বরাদ্দ না পাওয়া আবেদনকারীদের একটি অংশ জানিয়েছেন, আমরা বছরের পর বছর আবেদন করেও প্লট পাইনি। কিন্তু যারা ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন, তারা একাধিক প্লট পেয়েছেন। প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকরাও বলছেন, আমাদের জমি অধিগ্রহণের সময় ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি, অথচ পরবর্তীতে সেই জমিই কোটি টাকায় বেচা-কেনা হয়েছে।
শহর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ স্থপতি ফারুক আহমেদ মনে করেন, পূর্বাচল প্রকল্পের মতো বৃহৎ উদ্যোগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বরাদ্দ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এমন বিতর্ক আরও বাড়বে। তিনি বলেন, সরকারি জমি বরাদ্দে ‘ডিজিটাল লটারি’ ও স্বচ্ছ স্কোরিং পদ্ধতি চালু করা উচিত, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো যায়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৬ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তার অবশিষ্ট জেরা অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে শেখ হাসিনার দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখও নির্ধারিত হয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেয়া এই বক্তব্য মামলার গতিপথ বদলে দিতে পারে। প্রশ্ন উঠছে—দুদকের তদন্ত কতটা স্বচ্ছ, আর ন্যায়বিচার কতটা স্বাধীনভাবে এগোচ্ছে।
তথ্য বলছে, এই মামলার পরিণতি এখন নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষ অবস্থানের ওপর।