নিজস্ব প্রতিবেদক | যশোর
হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগে যশোরের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, প্রশ্নের মুখে ৭৬ লাখ টাকার বিল পরিশোধ
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ অমান্য করে যশোর জেলার ১০টি এলএসডি খাদ্য গুদামে শ্রম ও হস্তান্তর কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অভিযোগ উঠেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) শেফাউর রহমানের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে সরকারি প্রায় ৭৬ লাখ টাকার বেশি অর্থ বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ছাড় করার অভিযোগও সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ক্ষুব্ধ ঠিকাদারেরা।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় তথ্য বলছে, যশোর জেলার ১০টি এলএসডি খাদ্য গুদামের মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সরকারি চাল ও ধান ক্রয়, সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হয়। এসব গুদামে খাদ্যশস্য ওঠানো–নামানোর কাজ নীতিমালা অনুযায়ী দরপত্রের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদারের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।
সূত্র জানায়, খুলনার দৌলতপুর এলাকার মেসার্স লোটাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সেলিম রেজা ২০২০ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই ১০টি এলএসডি গোডাউনে হ্যান্ডলিং শ্রমিকের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করেন। এরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু না করেই জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিজ উদ্যোগে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক দিয়ে একই কার্যক্রম চালু করেন।
এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক ঠিকাদার হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিট নং ৬৫১৭/২০২৫-এর শুনানি শেষে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল আদালত মাস্টাররোল ভিত্তিতে শ্রম ও হস্তান্তর কার্যক্রম পরিচালনার ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন। পরে ৩০ জুলাই একই রিটে আরও তিন মাসের স্থগিতাদেশ জারি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেফাউর রহমান মাস্টাররোল ভিত্তিতে শ্রমিক দিয়ে কাজ চালু রাখেন এবং বিভিন্ন মাসের বকেয়া মজুরি বাবদ ৭৬ লাখ ২২ হাজার ২ টাকা নিজের স্বাক্ষরে বিল-ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করেন। খাদ্য অধিদপ্তরের বিধিমালা অনুযায়ী, আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালে এমন অর্থ ছাড়ের সুযোগ নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা খাদ্য অফিসের একাধিক কর্মকর্তা বলেন,
“আমরা বারবার স্যারকে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তিনি ঢাকা থেকে নির্দেশনার কথা বলে সবকিছু স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করেন। বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়নি।
রিটকারী ঠিকাদার মিজানুর রহমান খান বলেন,
“খুলনা বিভাগের অন্য সব জেলায় নিয়ম মেনে ঠিকাদারের মাধ্যমে এলএসডি গোডাউনের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। শুধু যশোরেই ব্যতিক্রম। এখানে ডিসি ফুড নিজেই কার্যত ঠিকাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
মেসার্স লোটাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সেলিম রেজা বলেন,
“সরকারি বিধান অনুযায়ী নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সর্বশেষ ঠিকাদারকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হয়। ২০২১ সালের ৯ আগস্ট খাদ্য মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন থাকলেও যশোরে তা মানা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
সরকারি ক্রয় ও শ্রম আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এক সাবেক অতিরিক্ত সচিব বলেন,
“উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে কোনো কাজ পরিচালনা ও অর্থ ছাড় করা হলে সেটি শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, আদালত অবমাননার শামিলও হতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একটি এলএসডি গোডাউনে বছরে গড়ে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার খাদ্যশস্য ওঠানামা করে। সেই হিসাবে ১০টি গোডাউন মিলিয়ে শত কোটি টাকার বেশি কার্যক্রম জড়িত—যেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে বিপুল রাষ্ট্রীয় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেফাউর রহমান বলেন,
“আমি কোনো আইন অমান্য করিনি। হাইকোর্টের আদেশ মেনেই সবকিছু করা হয়েছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় জেলার ১০টি এলএসডি গোডাউনের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে শ্রম ও হস্তান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।”
দুদকে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“বিষয়টি আমার জানা নেই। দুদক তদন্ত করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে—এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
প্রশ্ন উঠছে
হাইকোর্টের দু’দফা স্থগিতাদেশের পরও কীভাবে শ্রম ও হস্তান্তর কার্যক্রম চলমান থাকলো? নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ৭৬ লাখ টাকার বেশি বিল কীভাবে ছাড় হলো? উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি এই কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত ছিল, নাকি বিষয়টি প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে চলেছে—এমন একাধিক প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।
দুদকের তদন্তে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা বেরিয়ে আসবে কি না, সে দিকেই এখন তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল।