এনবিআর চেয়ারম্যান বিদেশে, আগুনে পুড়ল ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন
স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা
ব্যক্তিগত সফরে কানাডায় চেয়ারম্যান — নিঃস্ব উদ্যোক্তারা ঘুরছেন এনবিআরের দ্বারে
১৮ অক্টোবর রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের ঘটনায় শত শত কোটি টাকার আমদানি পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো উদ্যোক্তা ও আমদানিকারক।
আর ঠিক এই সময়েই দেশের শীর্ষ রাজস্ব সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)–এর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব আবদুর রহমান খান ছিলেন বিদেশ সফরে—প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র, পরে কানাডায় ব্যক্তিগত ছুটিতে।
তথ্য বলছে, আগুন লাগার দিনটিই ছিল তার সরকারি সফরের শেষ দিন, কিন্তু দেশে না ফিরে তিনি পরদিনই ব্যক্তিগত সফরে কানাডায় চলে যান।
প্রশ্ন উঠছে—দেশের এমন এক অর্থনৈতিক দুর্যোগের মুহূর্তে রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান কেন বিদেশে অবস্থান করলেন?
অগ্নিকাণ্ডে পুড়ল শত মিলিয়ন ডলারের পণ্য
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে লাগা ওই আগুনে আমদানি-রপ্তানির জন্য প্রস্তুত বিপুল পরিমাণ পণ্য ধ্বংস হয়েছে।
তথ্য বলছে, ক্ষতির পরিমাণ শত মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
রপ্তানি প্রস্তুত পণ্য ছাড়াও পুড়ে গেছে ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, কাঁচামাল, পোশাক ও কৃষিপণ্য—যার অধিকাংশের শুল্ক ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
একজন আমদানিকারক বলেন-
আমরা এনবিআরের নিয়ম মেনে সব শুল্ক পরিশোধ করেছি। এখন পণ্য নাই, কিন্তু কর ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। এনবিআরের কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না—চেয়ারম্যান নাকি বিদেশে!
অন্য এক উদ্যোক্তা অভিযোগ করেন, আগুনে আমার তিনটি চালান পুড়ে গেছে। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছি না। শুল্ক ফেরতের জন্য আবেদন দিয়েছি, কিন্তু সিদ্ধান্ত কেউ নিচ্ছে না।
সূত্র জানায়, এনবিআরের কর্মকর্তারা চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাচ্ছেন না।
অপেশাদার আচরণে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা
বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে এমন ভয়াবহ বিপর্যয়ের সময় এনবিআরের শীর্ষ কর্তা দেশের বাইরে থাকাটা অপেশাদার আচরণ, এবং দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক।
বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বারস অ্যান্ড কমার্স (এফবিসিসিআই)-এর এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এনবিআর শুধু কর আদায় নয়, সংকটকালীন নীতি-সহায়তার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চেয়ারম্যানের বিদেশে থাকা আমাদের হতাশ করেছে। এতে রাজস্ব-বাণিজ্য সমন্বয় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
একই মতামত দিয়েছেন ব্যবসায়ীদের আরেক শীর্ষ সংগঠনের নেতা— আমাদের ব্যবসা আগুনে শেষ, আর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছুটিতে। এটা এক ধরনের নৈতিক অবহেলা।
বিদেশ সফরের সময়সূচি ও প্রশ্ন
সরকারি নথি অনুসারে, চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান ১৩ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি সফরে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন।
তবে ১৯ অক্টোবর দেশে ফেরার বদলে তিনি আরও ১০ দিনের ব্যক্তিগত ছুটিতে কানাডা চলে যান।
প্রশ্ন উঠছে—দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বপ্রধান কি এই মুহূর্তে বিদেশে থাকা যুক্তিযুক্ত ছিল?
দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে কি বিকল্প দায়িত্বভার নির্ধারিত ছিল?
বিদেশ সফর অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রটোকল মেনে চলা হয়েছে কি না?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার বিদেশ সফরে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু অনেক সচিব ও উপদেষ্টা সেটি মানছেন না। এই ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ও ক্ষুব্ধ।
‘তথ্য বলছে’—রাজস্ব ফেরতের জটিলতা
এনবিআরের এক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, পণ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফেরতের আবেদন জমা পড়েছে।
তবে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এখনো কোনো ফেরত প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
এক উপকমিশনার বলেন, চেয়ারম্যান ছাড়া বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমরা কেবল রিপোর্ট পাঠাচ্ছি।
তথ্য বলছে, পণ্য ধ্বংসের ঘটনায় আইনি কাঠামোর মধ্যে শুল্ক ফেরতের সুযোগ থাকলেও, তা কার্যকর করতে প্রশাসনিক অনুমোদন প্রয়োজন। চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকায় এই প্রক্রিয়া থেমে আছে।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা’ অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন,এই অগ্নিকাণ্ড শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। রাজস্ব সংস্থা যদি সংকটকালে নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে করদাতার আস্থা ভেঙে পড়ে।
তিনি আরও বলেন,
দেশের কর কাঠামো আমদানি-নির্ভর। এই ধরণের ঘটনা হলে রাজস্ব ও বাণিজ্য উভয়ক্ষেত্রে আঘাত লাগে। এর প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও বাজেট ঘাটতিতেও।
অন্যদিকে, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ রওশন আরা মনে করেন— কোনো জাতীয় সংস্থার প্রধান যদি দেশের বড় সংকটে অনুপস্থিত থাকেন, সেটি প্রতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির জন্য ভয়াবহ বার্তা দেয়। বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে এখন দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্ষতির পরিসংখ্যান
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স ও আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগুনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১০০ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।
বাংলাদেশের পোশাক ও আমদানি শিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, এ ধরনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে।
তথ্য বলছে— পুড়ে গেছে ১,২০০টির বেশি কনটেইনার ও প্যাকেজ। ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় ২,৮০০। ইতোমধ্যে পরিশোধিত শুল্কের পরিমাণ আনুমানিক ১,৪০০ কোটি টাকা।
সরকারের অবস্থান
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন না মানায় উচ্চপর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সূত্রটি বলে, বিদেশ সফরের সময় দায়িত্ব হস্তান্তর না করায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও এই বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিতে পারেন।
অন্যদিকে, এনবিআরের এক সিনিয়র কর্মকর্তা দাবি করেন,
চেয়ারম্যান সফরে থাকলেও আমাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। তবে পণ্য ক্ষতির বিষয়টি জটিল, কারণ প্রতিটি আবেদন যাচাই করতে সময় লাগে।
ভুক্তভোগীদের আর্তি
‘কর নিয়েছি, পণ্য নাই’ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এনবিআর ভবনের সামনে কয়েক দফা গিয়ে ফেরত এসেছেন।
একজন আমদানিকারক আবেগে বলেন,
“আগুনে পুড়ে ব্যবসা শেষ, এখন করের টাকাও ফেরত দিচ্ছে না। চেয়ারম্যানের বিদেশ সফর আমাদের জন্য মৃত্যুর সমান।
অন্যদিকে, একজন রপ্তানিকারক বলেন,
আমরা সরকারের নিয়ম মেনেই কাজ করি। কিন্তু সংকটে সরকারের লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এনবিআরের অফিসে সবাই নীরব।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন আলোচনায়— জরুরি মুহূর্তে দায়িত্বহীন বিদেশ সফর কি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল?
শুল্ক ফেরতের আইনি কাঠামো কতটা কার্যকর? রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে কী সংস্কার প্রয়োজন?
প্রশ্ন উঠছে—এমন অনিশ্চয়তায় রাজস্ব প্রশাসনের প্রতি করদাতার আস্থা টিকবে কীভাবে?
আগুনের তদন্ত ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুনের কারণ অনুসন্ধানে তিনটি কমিটি কাজ করছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনায় শুধু অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং প্রশাসনিক আগুনও জ্বলে উঠেছে।
এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন,
আগুনের তাপ কমে গেছে, কিন্তু প্রশাসনিক অবহেলার তাপ এখনো জ্বলছে।
তথ্য বলছে, অগ্নিকাণ্ডে অর্থনীতিতে বিশাল ক্ষতি হয়েছে, আর রাজস্ব প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা সেই ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। অভিযোগ উঠছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি দেশের সংকট মুহূর্তে দায়িত্ব থেকে দূরে ছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রীয় সচেতনতার এক কঠিন পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়—সরকার এই ঘটনাকে কীভাবে নেয় এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে দায়-এড়ানো কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনে কিনা।
তথ্য বলছে: আগুনে পুড়েছে শত মিলিয়ন ডলারের পণ্য
সূত্র জানায়: এনবিআর চেয়ারম্যান বিদেশে থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেমে গেছে
অভিযোগ উঠছে: কর আদায়ের পরও ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা ন্যায্য ফেরত পাচ্ছেন না
প্রশ্ন উঠছে: রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ কোথায় গেল এই সংকটে?