এলজিআরডির অডিট নিয়োগে ঘুষ, দুদকের অনুসন্ধান শুরু
নিজস্ব প্রতিবেদক:
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের (এলজিআরডি) অধীন অডিট অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) শেখ মোহাম্মদ ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে ৪২ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তথ্য বলছে, দুদকের উপপরিচালক খায়রুল হক বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে ৬১টি ব্যাংক ও তিনটি জেলার প্রশাসনের কাছে ওমর ফারুক, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা হিসাব ও সম্পদের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
সূত্র জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুদক পেয়েছে, অডিট অধিদফতরের দায়িত্বে থাকার সময় ওমর ফারুক প্রতি অডিট টিম নিয়োগে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিতেন। এভাবে এলজিআরডি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইউনিটে অডিট টিম নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘুষের বাণিজ্যে পরিণত করা হয়।
একাধিক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ঘুষের বিনিময়ে তিনি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির সুযোগ করে দিতেন, যা সরকারি অর্থ আত্মসাতের একাধিক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ উঠছে, সাবেক সংসদ সদস্যদের পরিচালিত ‘লুটপাটের প্রকল্পগুলোর’ অডিট আপত্তির ফাইলও ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন করতেন ওমর ফারুক। ফলে বহু প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
দুদক সূত্র বলছে, প্রাথমিক যাচাইয়ে দেখা গেছে, সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকা প্রায় ৪২ কোটি টাকা অনির্ধারিত অবস্থায় রয়েছে। এই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর বা নগদে উত্তোলনের অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে।
প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ওমর ফারুকের আয় ও সম্পদের যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়েছে—তার উৎস কী? এলজিআরডি’র প্রকল্প অডিটে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের এই দুষ্টচক্রে কারা কারা যুক্ত ছিলেন, সেটিও এখন দুদকের নজরদারিতে রয়েছে।
অন্যদিকে, ওমর ফারুকের পরিবারের সদস্যদের নামেও অপ্রদর্শিত সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করেছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। এসব তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে, আত্মসাৎ করা অর্থ পরিবারের নামে বিনিয়োগ বা সম্পদ ক্রয়ে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা।
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি শুধু নিজে নয়, ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মাধ্যমেও অর্থ বাণিজ্য চালাতেন। অনুসন্ধান শেষ হলে আইনি পদক্ষেপের পথ খুলবে।
তথ্য বলছে, সরকারি অডিট ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ‘ঘুষের টেবিল সংস্কৃতি’ চালু ছিল। বিশেষ করে কিছু প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তা এই সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠানগত পর্যায়ে বৈধতার ছায়া দিয়ে গেছেন।
দুদক সূত্র আরও জানায়, ওমর ফারুকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অডিট কর্মকর্তা ও এলজিআরডির একাধিক প্রকল্প প্রধানকেও নজরদারিতে আনা হয়েছে। তদন্তে প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অর্থ আত্মসাত ও ঘুষ লেনদেনের এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে।
দুদকের একজন সাবেক কমিশনার বলেন, “এই ধরনের অডিট দুর্নীতি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়। অনুসন্ধানটি যদি নিরপেক্ষভাবে শেষ হয়, তাহলে অডিট অধিদফতরের অভ্যন্তরীণ চক্রও উন্মোচিত হবে।”
প্রতিবেদনের শেষ প্রান্তে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—কীভাবে এক জন সরকারি কর্মকর্তা, যার দায়িত্ব ছিল সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, তিনিই কীভাবে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযুক্ত হয়ে উঠলেন? এবং কেন এত বছর পর সেই অনিয়মের জাল উন্মোচিত হচ্ছে?