
বিশেষ প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের নবীন উদ্যোক্তাদের আশার প্রতীক হিসেবে একসময় যাকে দেখা হতো, সেই সোনিয়া বশির কবিরের নাম আজ বিতর্কের কেন্দ্রে। আলোচিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান এসবিকে টেক ভেঞ্চারস লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে এখন অভিযোগ উঠেছে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাতের।
তথ্য বলছে, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোটি টাকার তহবিল আত্মসাৎ, উদ্যোক্তাদের অর্থ ফেরত না দেওয়া এবং সরকারি তহবিল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শুরু করেছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, প্রাথমিক তদন্তে প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে। এরই মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। তবে ঘটনাটি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির নয়—এতে জড়িয়ে পড়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু—এই দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও তদন্তে এসেছে।
স্টার্টআপ খাতে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ :
বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তারা গত এক দশকে প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এই ঘটনায় সেই খাতেই নেমেছে আস্থার সঙ্কট।
উদ্যোক্তাদের ভাষায়, “বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়ে আমরা ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু টাকা পেলাম না, সময় কেটে গেল, বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
অভিযোগ উঠেছে—এসবিকে টেক ভেঞ্চারস সরকারি তহবিল ও বেসরকারি বিনিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও, সেই অর্থের বড় অংশ উদ্যোক্তাদের কাছে যায়নি।
তথ্য বলছে, এই তহবিলের মাধ্যমে মার্কোপোলো, ফসল, যাত্রী, টেন মিনিট স্কুল, অরোগ্য ও সলশেয়ার—এসব সম্ভাবনাময় স্টার্টআপের সাথে বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কেউই নির্ধারিত অর্থ পাননি।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসবিকে টেক ভেঞ্চারস এক ঘোষণায় দাবি করে, তারা ৭১ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, “এটি নিছক প্রচারণা—কোনো প্রকৃত অর্থ লেনদেন হয়নি।”
সরকারি তহবিলের প্রশ্নে অনিয়মের গন্ধ :
সূত্র জানায়, সোনিয়া বশির কবির সাবেক সরকারের কাছ থেকে স্টার্টআপ উন্নয়ন তহবিল (Startup Bangladesh Fund) থেকে অর্থ পেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল—দেশীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা, নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে মূলধন জোগানো।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে—এই তহবিলের অর্থ উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ না করে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।
একজন স্টার্টআপ মালিক বলেন :
আমাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু পরিশেষে কোনো তহবিল পেলাম না। একাধিকবার ইমেইল, নোটিশ পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।”
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ই-মেইল, এবং খসড়া চুক্তিপত্রে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। এমনকি অভিযুক্ত পক্ষের কাছ থেকেও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুত বার্তা পাওয়া গেছে।
তারানা হালিমের ভবনে অফিস: নতুন প্রশ্ন
তদন্তে আরও জানা গেছে, এসবিকে টেক ভেঞ্চারসের গুলশান অফিসটি অবস্থিত ছিল সাবেক তথ্য ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের মালিকানাধীন ভবনে।
প্রশ্ন উঠছে—তারানা হালিমের সঙ্গে এই ব্যবসায়িক সম্পর্ক কি কেবল ভাড়া ভিত্তিক, নাকি এর পেছনে অন্য আর্থিক যোগসূত্রও আছে? পিবিআই বলছে, এ বিষয়ে তথ্য যাচাই চলছে।সূত্র জানায়, তারানা হালিমের নামে বিদেশে টাকা পাঠানো হয়েছিল কি না—এমন সন্দেহও তদন্তের আওতায় আছে।
এক নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তা বলেন,:
আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি যা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যাচাই-বাছাই চলছে।
এদিকে তারানা হালিমের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিপুর নামও তদন্তে:
অন্যদিকে, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু-এর সঙ্গে সোনিয়া বশিরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে একাধিক সূত্র জানায়।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যাচাই করছে, এই সম্পর্কের মাধ্যমে কোনো তহবিল স্থানান্তর বা বিদেশে সম্পদ গঠনের ঘটনা ঘটেছে কি না।
সূত্র জানায়, লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রে বিপুর নামে একাধিক সম্পত্তি ও ব্যবসা রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে বিপুর কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এক অর্থনৈতিক অপরাধ বিশ্লেষক বলেন
প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সংযোগ থাকলে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এজন্য প্রয়োজন স্বাধীন ও পেশাদার তদন্ত।
পিবিআই প্রতিবেদন: প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে :
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে সোনিয়া বশির কবির এক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ১ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন।
চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল লভ্যাংশসহ, যার বর্তমান মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই কোটি নয় লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
তথ্য বলছে, বিনিয়োগকারী জেরিন চৌধুরী ২০২৩ সালে সোনিয়া বশিরের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা দায়ের করেন—অর্থাৎ বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগে।
পিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে—
ব্যাংক স্টেটমেন্টে লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে,
অভিযুক্ত ব্যক্তির ই-মেইল ও বার্তায় বিনিয়োগের স্বীকৃতি রয়েছে,
একাধিকবার ফেরত চাওয়ার পরও অর্থ প্রদান করা হয়নি,
এমনকি ৮৫ লাখ টাকার “ব্যক্তিগত ঋণ” নেওয়ার ঘটনাও মিলেছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করেন:
“অভিযুক্ত ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রতারণা করে, লভ্যাংশ প্রদানের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।”
স্টার্টআপ খাতের ক্ষত: আস্থা হারানোর ভয় স্টার্টআপ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন,
“এমন প্রতারণা পুরো ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করে দেয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশি স্টার্টআপে বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন।
একাধিক উদ্যোক্তা বলছেন, সোনিয়া বশিরের কর্মকাণ্ডে শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইমেজ আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘ফসল’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাকিব বলেন,
প্রতিশ্রুতি দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়—এটি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। এই ঘটনা আমাদের বিদেশি পার্টনারদের আস্থা নষ্ট করেছে।”
কোটি টাকার লেনদেনের ছক:
তথ্য বলছে, এসবিকে টেক ভেঞ্চারস শুধু এক বা দুইটি নয়—একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য,এক প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে ১৫ কোটি টাকা, ফাইবার হোম লিমিটেডের কাছ থেকে ১২ কোটি টাকা, একাধিক ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ছোট ছোট অঙ্কে মোট ৮ কোটি টাকার বেশি। এই অর্থের বেশিরভাগ অংশ ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন:
“এসব ঘটনার আইনি পরিণতি হতে পারে গুরুতর। বিশেষ করে যদি প্রমাণ হয় অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংযোগ ও হুন্ডি সন্দেহ
তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি বিশেষভাবে নজরদারিতে আছে।
লন্ডন, দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রে এসবিকে টেক ভেঞ্চারসের সঙ্গে যুক্ত কিছু অ্যাকাউন্ট ও সম্পদ শনাক্ত করা হয়েছে।
একটি নিরাপত্তা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিদেশে থাকা কিছু সহযোগীর নামও চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জশিট আদালতে দাখিল হয়নি।
সোনিয়া বশিরের প্রতিক্রিয়া:
‘প্রতিবেদন প্রকাশ না করতে’ অনুরোধ অনুসন্ধান দল সোনিয়া বশির কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বিষয়টি অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। কিছু ব্যবসায়িক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, যা সমাধানের পথে। তবে তিনি এ প্রতিবেদনের প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। নিজেকে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, বর্তমানে আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপির এক তরুণ নেতা, যিনি ভবিষ্যতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
এই বক্তব্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে
—প্রতিষ্ঠানের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর? অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের অভিমত ঢাকা স্কুল অব ইকনমিক্সের অধ্যাপক ড. মুনতাসির আলম বলেন,
বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখনো নাজুক। বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস অর্জনই মূল পুঁজি। সেখানে প্রতারণা হলে বিদেশি বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আর্থিক জবাবদিহি না হলে, বাংলাদেশের ডিজিটাল ইকোনমি ঝুঁকিতে পড়বে।”
আইনি অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ :
পিবিআই-এর একটি সূত্র জানায়, তদন্তের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি ব্যাংক লেনদেন, হুন্ডি রুট ও সম্পদ যাচাই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানিয়া ফেরদৌস বলেন,“যদি প্রমাণিত হয় যে সরকারি তহবিল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জিত হয়েছে, তাহলে এটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।
আস্থার সংকটে বাংলাদেশের স্টার্টআপ :
তথ্য বলছে, এক দশকে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত এখন এক ধরনের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে।
অভিযোগ, প্রতারণা ও অনিয়ম শুধু উদ্যোক্তাদের নয়—একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্মের স্বপ্নকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এক তরুণ উদ্যোক্তার ভাষায়,:
“আমরা প্রযুক্তি দিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি ও প্রতারণা। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে এখন দরকার—
স্বচ্ছ তহবিল ব্যবস্থাপনা, নিরপেক্ষ তদন্ত, এবং উদ্যোক্তা সুরক্ষার আইন। না হলে বাংলাদেশের স্টার্টআপ আন্দোলন হয়তো আর কখনোই আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারবে না।
প্রশ্ন উঠছে—সোনিয়া বশির কবির কি কেবল এক ব্যক্তির প্রতারণা, নাকি বাংলাদেশের স্টার্টআপ স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক?