
ইসলাম সবুজ
খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (কেএমসি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজারো রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে হাসপাতালটির নিজস্ব ফার্মেসিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে অনেক রোগীকে বাইরে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে- যা প্রশ্ন তুলেছে সরকারি বরাদ্দ, ওষুধ সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে।
সরকারি বাজেট বড়, কিন্তু বরাদ্দের তথ্য অস্পষ্ট: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রাথমিকভাবে ৪৩৪.৮৩ বিলিয়ন টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর কত অংশ সরাসরি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর ওষুধ ক্রয় ও সরবরাহে ব্যয় হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের জন্য রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ প্রদানে ১২ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বরাদ্দ রাখা হলেও, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্ষেত্রে এমন কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দের তথ্য পাওয়া যায়নি।
রোগীদের অভিযোগ: ‘ওষুধ চাইলে বলা হয়, বাইরে থেকে নিন’ ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ কেএমসির বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে ইনডোর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
বাগেরহাটের রোগী নুরুল ইসলাম বলেন, ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন, কিন্তু ফার্মেসিতে বলল, এই ওষুধ নেই। বাইরে থেকে কিনতে হলো দুই হাজার টাকার ওষুধ। একই অভিযোগ খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার গৃহবধূ শিরিন আক্তারের, আমি সরকারি হাসপাতালে এসেছি যেন খরচ কম হয়, কিন্তু বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে গিয়ে আরও কষ্টে পড়েছি। চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীই বলেন, হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও প্রাথমিক ইনজেকশন বা ব্যথানাশক পর্যন্ত বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: বাজেট ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তাক আহমেদ বলেন, সরকার প্রতিবছর স্বাস্থ্যখাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার সঠিক বাস্তবায়ন হয় না। ওষুধ সরবরাহ চেইনে দুর্বলতা, ক্রয় বিলম্ব ও মজুদ সংকটই রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কেনায় বাধ্য করছে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর খুলনা অঞ্চলের সমন্বয়ক বলেন, কেএমসি’র মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে যদি রোগীরা বিনামূল্যে ওষুধ না পান, তবে এটা সিস্টেমিক ত্রুটি। বরাদ্দের পরিমাণ ও ব্যয় দুই-ই স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা উচিত।
কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে চারটি বড় সংকট এখানে। ১. অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ: বরাদ্দের পরিমাণ প্রকৃত চাহিদার তুলনায় কম। ২. বাজেট বাস্তবায়নে দেরি: অর্থ ছাড়ে বিলম্ব ও বছরের শেষদিকে তড়িঘড়ি খরচের প্রবণতা। ৩. সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা: ক্রয় ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের অভাব, দীর্ঘ টেন্ডার প্রক্রিয়া। এবং ৪. মজুদ ব্যবস্থাপনার ত্রুটি: ফার্মেসিতে ওষুধ ঘাটতি ও রেকর্ড হালনাগাদে বিলম্ব।
এ ব্যাপারে সুশীল সমাজের মতামত হলো- সরকারি হাসপাতাল জনগণের ভরসার জায়গা। সেখানে যদি ওষুধ না পাওয়া যায়, তবে সেটা শুধু রোগীর বঞ্চনা নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপ: কেএমসিসহ সকল সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ বরাদ্দ ও ব্যবহারের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। হাসপাতালভিত্তিক ‘নির্ধারিত ওষুধ তালিকা’ হালনাগাদ রাখতে হবে যাতে রোগী জানেন কোন ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। সরবরাহ চেইন আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা জরুরি। বাজেট বরাদ্দ সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে রোগীদের মৌলিক ওষুধপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে- এমনটাই বলছেন স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, ওষুধের অভাবে রোগী যেন দ্বিতীয়বার ভোগান্তিতে না পড়েন- সেটাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।