
স্টাফ রিপোর্টার |
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন প্রশাসনে সদস্য পদে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে উঠছে নানান প্রশ্ন। সদ্য পদোন্নতির পর থেকেই রপ্তানি ও বন্ড উইংয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায়, প্রশাসনের অভ্যন্তরে এবং কর প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য বলছে, ১৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই এনবিআরের প্রভাবশালী কিছু কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ মহলে সক্রিয় ছিলেন।
সূত্র জানায়, মোয়াজ্জেম হোসেন সম্প্রতি ওএসডি হওয়া সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত। বেলাল চৌধুরী দীর্ঘদিন এনবিআরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, বেলাল চৌধুরীর অব্যাহতির পরও তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে প্রভাব খাটানো অব্যাহত রয়েছে, যার অন্যতম হলেন মোয়াজ্জেম হোসেন।
দায়িত্ব পেতেই বন্ড খাতের নিয়ন্ত্রণ
পদোন্নতির পরপরই রপ্তানি ও বন্ড উইংয়ের দায়িত্ব পান মোয়াজ্জেম হোসেন। কর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি এনবিআরের অন্যতম কৌশলগত ও লাভজনক ইউনিট, যেখানে দুর্নীতির সুযোগ সবচেয়ে বেশি বলে অতীতে বহুবার অভিযোগ উঠেছে।
একজন সাবেক এনবিআর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“বন্ড খাতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার ছাড় ও রেয়াত দেওয়া হয়। এখানে স্বচ্ছতা না থাকলে সরকারি রাজস্বের বিশাল অংশ হাতছাড়া হয়। নতুন সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু পুরনো গোষ্ঠী আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে শোনা যাচ্ছে।”
প্রশ্ন উঠছে—রপ্তানি ও বন্ডের মতো সংবেদনশীল খাত কেন বারবার একই ধরণের প্রভাবশালীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়?
তথ্য বলছে, গত দশ বছরে এই খাতে অডিট বা স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বেশিরভাগই থেমে গেছে রাজনৈতিক প্রভাব বা উচ্চপর্যায়ের তদবিরের কারণে।
রাজনৈতিক সংযোগ নিয়ে আলোচনায়
সূত্র জানায়, এনবিআর সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং বিমানবন্দর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফাতেমা জামান সাথীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়—এক অনুষ্ঠানে ফাতেমা জামান সাথী নিজ হাতে কেক খাইয়ে দিচ্ছেন মোয়াজ্জেম হোসেনকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়রা ইয়াসমিন বলেন—
“দলীয় প্রভাব বা ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে দুর্বল করে দেয়। এনবিআরের মতো রাজস্ব সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানে এটি ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।”
এনবিআরের অভ্যন্তরে ‘সিন্ডিকেট’ সংস্কৃতি
তথ্য বলছে, বর্তমানে এনবিআরের ভেতরে ‘সদস্য সিন্ডিকেট’ নামে একটি প্রভাববলয় সক্রিয় রয়েছে, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, সদস্য বেলাল হোসেন চৌধুরী (ওএসডি) এবং নতুন সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন।
অভিযোগ উঠেছে, রাজস্ব প্রশাসনের পদায়ন, বদলি ও প্রকল্প অনুমোদনে এ সিন্ডিকেটের অঘোষিত প্রভাব রয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“যারা নিরপেক্ষ থেকে কাজ করতে চায়, তাদের ঠেকিয়ে রাখা হয়। যারা সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ, তারাই বিদেশ সফর, প্রকল্প বা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব পায়।”
একজন প্রাক্তন সদস্য দাবি করেন, সিন্ডিকেটটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজস্ব নীতির দিকনির্দেশনাতেও প্রভাব ফেলে আসছে।
তথ্য বলছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় হয়েছে ৪ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নীতিগত দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ প্রভাব ও ‘সিন্ডিকেট চেইন’-এর কারণে এই ঘাটতি আরও বেড়েছে।
একজন অর্থনীতি গবেষক বলেন—
“যখন প্রশাসনের ভেতরে নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা থাকে না, তখন রাজস্ব ক্ষতির শৃঙ্খল তৈরি হয়। রাজস্ব লুটে ব্যক্তি লাভ হয়, কিন্তু রাষ্ট্র হারায় উন্নয়ন বাজেট।”
প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে এনবিআরের মতো প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি হচ্ছে?
কেন গুরুত্বপূর্ণ বন্ড ও রপ্তানি ইউনিটে একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো?
দুর্নীতি দমন কমিশন কি এসব প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাবে?
সূত্র জানায়, একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এনবিআরের নতুন প্রশাসনে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ বা ‘ঘনিষ্ঠতা’কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
একজন কর কমিশনার বলেন—
“দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মোয়াজ্জেম হোসেন তার নিজস্ব বলয় তৈরি করছেন। কিছু কর্মকর্তাকে তিনি বিশেষ সুবিধা দিয়ে কাছে টানছেন। এতে প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উদয়ের পথে–কে বলেন—
“দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কার সম্ভব নয়। কর নীতি ও রাজস্ব সংগ্রহে রাজনৈতিক প্রভাব মানে দুর্নীতির ক্ষেত্র উন্মুক্ত রাখা।”
তিনি আরও বলেন—
“প্রতিবারই নতুন প্রশাসন আসে, কিন্তু পুরনো প্রভাবশালীদের হাতেই থাকে নীতিনির্ধারণের রাশ। এটি পরিবর্তন না হলে রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরবে না।”
জনমনে প্রতিক্রিয়া
করদাতা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এনবিআরের প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট সংস্কৃতি বন্ধ না হলে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসবে না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের এক সদস্য বলেন—
“যদি কর ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা হারিয়ে যায়, তাহলে কর ফাঁকি বেড়ে যাবে। এতে ক্ষতি হবে সরকারেরই।
এনবিআরের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বলয় ও বিতর্কিত পদোন্নতি নিয়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এখন প্রশ্নের মুখে।
তথ্য বলছে—এটি শুধু একটি পদোন্নতি নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থার ভেতরে চলমান একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন রয়ে যায়—নতুন প্রশাসনে কি এবার সত্যিই সংস্কারের হাওয়া বইবে, নাকি আবারও পুরনো সিন্ডিকেটের হাতেই বন্দী থাকবে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা?