
সৌদি বাংলা ট্রাভেলস’-এর নামে হজ প্রতারণা: শামসুদ্দিন তোহার
জাহিদ সুমন :
দক্ষিণাঞ্চলে হজযাত্রীদের কোটি টাকার প্রতারণা, সৌদি বাংলা ট্রাভেলস’ ব্যানারে অভিযুক্ত শামসুদ্দিন তোহা, প্রশ্ন উঠছে তদারকিতে গাফিলতি নিয়ে
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে পবিত্র হজযাত্রাকে ঘিরে চলছে একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার চক্র—এমন অভিযোগ উঠছে ভুক্তভোগী হজযাত্রীদের কাছ থেকে। “সৌদি বাংলা ট্রাভেলস” নামের একটি অনুমতিহীন ট্রাভেল এজেন্সির ব্যানারে বাগেরহাট জেলার ডেমা গ্রামের শামসুদ্দিন তোহা নামে এক ব্যক্তি গত কয়েক বছর ধরে অসংখ্য মানুষকে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে হাজারেরও বেশি হজযাত্রী তার কাছে হজে যাওয়ার জন্য টাকা জমা দেন। কিন্তু কেউই পবিত্র মক্কা-মদিনায় হজে যেতে পারেননি। বরং সময়ক্ষেপণ, মিথ্যা আশ্বাস ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন অভিযুক্ত তোহা।
মতিঝিল থেকে বাপ্পি অভিযোগ করে বলেছে তার কাছ থেকে নিয়েছে ১০ লক্ষ টাকা, তোহাকে একবার ধরা হয়েছিল পরে তার পরিবার এসে টাকা দিবে বলে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে,
ঢাকা স্টাফ কোয়াটারের মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “আমি ২০২২ সালে হজের জন্য ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তোহা ভাই বলেছিল সব ঠিক আছে। কিন্তু পরে হঠাৎ বলল, সরকার নাকি কোটা কমিয়ে দিয়েছে—তাই এ বছর যাওয়া যাচ্ছে না। পরে আবার যোগাযোগ করলে সে মোবাইল বন্ধ করে দেয়।”
আরেক ভুক্তভোগী রওশন আরা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, “হজ করার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। জমি বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু আজও হজে যেতে পারিনি, টাকাও ফেরত পাইনি।”
তথ্য বলছে, এই ধরনের অভিযোগ শুধু ঢাকা নয়, বাগেরহাট, খুলনা, পিরোজপুর ও বরিশালের অন্তত ১১টি উপজেলার হজপ্রত্যাশী মুসলমানদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, অনুমতিহীন একটি ট্রাভেল এজেন্সি কীভাবে টানা পাঁচ বছর ধরে এত বড় প্রতারণা চালিয়ে যেতে পারে— অথচ কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম বলেন, “এটা কোনো একদিনের ঘটনা নয়। তোহার বিরুদ্ধে থানায় বহু অভিযোগ পড়েছে। কিন্তু তাকে আজও ধরা হয়নি। গ্রেফতার হলেও কিছু টাকার বিনিময়ে সে আবার বেরিয়ে আসে বলে শোনা যায়।”
সূত্র জানায়, স্থানীয় থানায় অন্তত ২৩টি পৃথক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে।
বাগেরহাট সদর থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তোহার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ আছে। কয়েকবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। শুনেছি ঢাকায় ও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে
তবে আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় আইনজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, “এই ধরনের প্রতারণা দমন করতে হলে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর নিবন্ধন ও কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি দরকার। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা উচিত।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ হজে যান। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশই বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে হজে অংশ নেন।
তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০০টির মতো অনুমোদিত হজ ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে। কিন্তু অনুমোদনবিহীন শতাধিক এজেন্সিও অবৈধভাবে হজের অর্থ সংগ্রহ করে আসছে—যার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশনের (হাব) একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রতারণা বন্ধ করতে হলে সরকারকে অনুমোদনহীন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। প্রতিটি হজযাত্রীর রেজিস্ট্রেশন ও ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতারিত হজযাত্রীদের অনেকেই জানিয়েছেন, এই ঘটনায় তাদের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি অপূরণীয়। তারা অভিযুক্ত শামসুদ্দিন তোহাকে দ্রুত গ্রেফতার করে অর্থ উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছেন।
ডেমা গ্রামের ভুক্তভোগী আবদুল হক বলেন, “আমরা চাই সরকারের উচ্চপর্যায় এই প্রতারণার বিচার করুক। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো হজযাত্রী এভাবে প্রতারিত না হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল হক বলেন, “হজযাত্রা একটি ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয়। তাই মানুষ খুব সহজে বিশ্বাস করে টাকা দিয়ে ফেলে। এই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা হয়। এটা বন্ধে ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন ও তদারকিতে ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নিতো, তবে হয়তো এই চক্র এত বছর ধরে সক্রিয় থাকতে পারত না।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এই ধরনের অভিযোগ পেলে যাচাই করে ব্যবস্থা নেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণা শুরু হয় স্থানীয় পর্যায়ে—যেখানে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের তদারকি পৌঁছায় না।
প্রশ্ন উঠছে, হজযাত্রীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেন এখনো কোনো শক্তিশালী আইন বা দ্রুত প্রতিকারব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
পবিত্র হজযাত্রা মুসলমানদের জন্য এক আজীবনের ইচ্ছা ও ধর্মীয় দায়িত্ব। সেই পবিত্র সুযোগকে পুঁজি করে এক শ্রেণির প্রতারক বছর বছর লাখ লাখ টাকার জাল বুনছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে শামসুদ্দিন তোহার ‘সৌদি বাংলা ট্রাভেলস’ প্রতারণা।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, যদি এবারও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে হজ প্রতারণা বাড়বে।
তথ্য বলছে, দেশে প্রতি বছর হজযাত্রীদের গড় বিনিয়োগ প্রায় ৬-৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের প্রবাহকে ঘিরে অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকায় কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নতুন করে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নজরে এনেছে বলে জানা গেছে।
এখন দেখার বিষয়—এই দীর্ঘদিনের প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হজযাত্রীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা সফল হয়।