সওজের প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান, অভিযোগে হাজার কোটি টাকার মালিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সরকারি প্রকৌশল খাতে দুর্নীতির চক্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন উঠছে। সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—দশকের পর দশক ধরে তিনি টেন্ডার কমিশন, ঘুষ, জমি দখল, ভুয়া এনজিও ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তুলেছেন হাজার কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য।
সরকারি নথি, স্থানীয়দের সাক্ষ্য, ভুক্তভোগীর বয়ান, এবং একাধিক সূত্রের তথ্যে উঠে এসেছে তার সম্পদের পাহাড়, ক্ষমতার দাপট ও জবাবদিহিহীনতা। প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে একজন সরকারি প্রকৌশলী সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন? কেন এত অভিযোগ সত্ত্বেও এখনো কার্যকর তদন্ত হয়নি?
সূত্র জানায়, সওজের ভেতরে সবুজ উদ্দিন খানকে ঘিরে এক ধরনের একক আধিপত্য গড়ে উঠেছিল। ঠিকাদাররা অভিযোগ করেছেন—কোনো কাজ করতে হলে তাকে মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে হতো ।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, প্রতি প্রকল্পে ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হতো। যদি কেউ আপত্তি করত, তার টেন্ডারই বাতিল হয়ে যেত।
প্রকৌশলী মহলের অভিযোগ, এভাবে তিনি একাধারে প্রকল্প অনুমোদন, বিল পাস, টেন্ডার মূল্যায়ন—সব জায়গায় অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। একসময় প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত তার ভয়ে নীরব থাকতেন।
অভিযোগ আছে রাজনৈতিক প্রভাব ও উচ্চপদে বহাল থাকার রহস্য, তথ্য বলছে, সবুজ উদ্দিন খান দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
এই রাজনৈতিক আশ্রয়েই তিনি একের পর এক পদোন্নতি পান এবং বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করেন। দলীয় সূত্র দাবি করে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলনের সময়ও তিনি প্রশাসনিক শক্তির পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন।
অভিযোগ আছে, তিনি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন আন্দোলন ঠেকাতে। এমনকি তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং গোয়েন্দা শাখার প্রধান হারুনকেও আর্থিক সুবিধা দিয়েছেন বলে শোনা যায়।
রাজনীতিবিদ বলেন রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া একজন প্রকৌশলী কীভাবে টানা আট বছর ঢাকা, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জের মতো কৌশলগত জেলায় দায়িত্বে থাকতে পারেন?
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী বেরিয়ে এসেছে, ঢাকার ধানমন্ডিতে একটি ছয়তলা বাড়ি, উত্তরায় একাধিক আবাসিক ভবন, বসুন্ধরা সিটিতে চারটি দোকান, এবং গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় বিপুল সম্পত্তি রয়েছে সবুজ উদ্দিন খানের।
সূত্র বলছে তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার পান্না ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে জমি, বাড়ি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির হিসাব করলে তা সরকারি চাকরির বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পাবনার আমিনপুরে প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সবুজ উদ্দিন খানের রাজকীয় ডুপ্লেক্স বাড়ি। চারপাশে উঁচু প্রাচীর, নিরাপত্তা প্রহরী, অভিজাত শৌখিনতা—যা গ্রামের সাধারণ মানুষের চোখে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য।
স্থানীয়দের ভাষায়, এ বাড়িটা দেখে মনে হয় কোনো মন্ত্রীর প্রাসাদ। অথচ তিনি কেবল একজন সরকারি চাকুরে।
একই এলাকায় আরও শতাধিক বিঘা জমি কিনেছেন তিনি ও তার স্ত্রী। সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি অনিবন্ধিত এনজিও ও বিদ্যালয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি আসলে কালো টাকা সাদা করার কৌশল।
বাড়ির পাশে বিশাল গরুর খামারও রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে ২০০টির বেশি গরু পালনের ব্যবস্থা।
শ্যামপুর গ্রামের আলী অভিযোগ করেন,আমার ১৫ কাঠা জমি দখল করেছে সবুজ উদ্দিন। আমি বিক্রি করতে রাজি ছিলাম না, তাই মাস্তান দিয়ে ভাড়া করেছে।
আরেক ভুক্তভোগী মজিদ বলেন, ওর নাম শুনলেই সবাই ভয়ে চুপ থাকে। স্থানীয় থানা থেকেও কোনো সাহায্য পাইনি।
সন্তোষ নামে এক কৃষক জানান,
আমাদের মতো গরিব মানুষদের জমি দখল করে বিলাসবহুল বাড়ি বানিয়েছে। আমরা মামলা করলে পুলিশ নেয় না।
এমন সাক্ষ্যে দেখা যায়, গ্রামীণ সমাজে সবুজ উদ্দিন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ থাকলেও, আইনি প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ, একজন ঘনিষ্ঠ সূত্র দাবি করেন,
তার সন্তানরা কানাডায় পড়াশোনা করছে। সেখানে সেকেন্ড হোম বানানো হয়েছে অবৈধ অর্থে। এছাড়া মালয়েশিয়াতেও বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার করেছেন।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরকারি তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি সংস্থা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
সবুজ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী টিম মাঠে কাজ করতে গেলে গ্রামে তার পালিত বাহিনী সাংবাদিকদের ঘেরাও করে। স্থানীয় সাংবাদিকদের বক্তব্য, তিনি একাধিকবার রিপোর্ট বন্ধ করতে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন এবং লাঞ্ছিত করেছেন।
এমনকি কয়েকজন প্রতিবেদক গোপনে জানান,তার নাম লিখলেই ফোন আসে। তিনি সরাসরি হুমকি দেন।
সবুজ উদ্দিন শুধু আমলা হিসেবেই প্রভাব বিস্তার করেননি, বরং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও দেখিয়েছেন। তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার পান্নাকে মহিলা এমপি বানানোর জন্য তৎকালীন প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে লবিং করেন। যদিও রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।
দুদকের নীরবতা: প্রশ্নের মুখে জবাবদিহি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত অভিযোগের পরও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কেন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি?
স্থানীয়রা বলছেন, মন্ত্রীদের আশ্রয়–প্রশ্রয়ের কারণেই দুদক নীরব থেকেছে।
একজন আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। ফলে দুদক প্রায়ই ‘বাছাই করা তদন্ত’ করে। এ ধরনের কেসে স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া কোনো সমাধান আসবে না।
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট সবুজ উদ্দিন খানকে প্রকল্প পরিচালক থেকে সরিয়ে সওজের রিজার্ভ পদে পাঠানো হয়। এর আগে টানা আট বছর মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
জনশ্রুতি রয়েছে যে আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনিই।
সবুজ উদ্দিন খানের বক্তব্য জানতে বারবার ফোন ও সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার পান্নার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
২০১০–২০১৫: মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরে দায়িত্বে থাকাকালে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ২০১৬–২০২৩: ঢাকা অঞ্চলে প্রকল্প পরিচালক; টেন্ডার ও জমি কেনাবেচায় সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ। ২০২৪: ধানমন্ডি ও উত্তরায় বাড়ি নির্মাণ সম্পন্ন। বসুন্ধরা সিটিতে দোকান কেনা হয়। ২০২৫ (আগস্ট): প্রকল্প পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে রিজার্ভ পদে পাঠানো হয়।
সবুজ উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তবে এটি কেবল একজন প্রকৌশলীর দুর্নীতি নয়—বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার মিলিত প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে? নাকি সবুজ উদ্দিন খানের মতো প্রভাবশালীরা সব সময়ই আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যাবে?