
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল: সিএনজির স্টার্ট বন্ধ করে যাত্রীকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাই, আটক মূলহোতাসহ চারজন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্টার্ট বন্ধ করে যাত্রীকে ছুরিকাঘাত ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তারা নিরীহ যাত্রীদের ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে চালকের সরাসরি সহায়তায়।
তথ্য বলছে, ১৬ আগস্ট রাত ৯টার দিকে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসা এক যাত্রী শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার ‘টেকনিক্যাল মোড়’ থেকে একটি সিএনজিতে ওঠেন। গন্তব্য ছিল আগারগাঁও। কিন্তু রাস্তায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনের সামনে চালক আকস্মিকভাবে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দেন। মুহূর্তেই গাড়ির চারপাশে ঘিরে ধরে তিনজন ব্যক্তি, যাদের একজন যাত্রীর গলায় ছুরি ধরে ফেলে, আরেকজন মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ। পরে বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা আদায় এবং পরিবারের কাছ থেকেও বিকাশের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে।
প্রশ্ন উঠছে, সড়কে নিরাপত্তা কোথায়?
ঘটনাটি শুধু একক কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সংগঠিত অপরাধচক্রের অংশ বলে ধারণা করছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই সিএনজিকে ‘চালক-সহযোগী ছিনতাই’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটা স্বাভাবিক ছিনতাই নয়। এখানে চালক নিজেই যাত্রীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছেন এবং অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করছেন। এটা সাধারণ অপরাধের চেয়েও গুরুতর।”
তথ্য বলছে, সংঘবদ্ধ চক্রের রয়েছে একাধিক সদস্য
ঘটনার পর ছায়া তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুলিশ প্রথমে সিএনজির নম্বর শনাক্ত করে। এরপর বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) ভোরে গাবতলী টেকনিক্যাল মোড় থেকে মূল অভিযুক্ত জাকির হোসেনকে সিএনজিসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যে অভিযান চালিয়ে আগারগাঁও এলাকা থেকে নজরুল ইসলাম (৪৭) ও মিজানুর রহমান (৪৫)-কে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় হাফিজুল ইসলাম ওরফে হাবু (৪৫) নামে আরও একজনকে।
তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় তিনটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও ছিনতাইকৃত দুটি মোবাইল ফোন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন সংঘবদ্ধ চক্র সড়কপথে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড, টার্মিনাল কিংবা হাসপাতালমুখী যাত্রীদের টার্গেট করে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে—যা আগাম গোয়েন্দা তথ্য ও নিয়মিত টহল দিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না বলে মত তাদের।
বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
যাত্রাপথে নিরাপত্তার দায়িত্ব যে চালকের, তিনিই যদি অপরাধে জড়িত হন, তাহলে সাধারণ মানুষ আর কার উপর আস্থা রাখবে? এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পুলিশি টহল ও প্রযুক্তি ব্যবহার আরও কার্যকর করা জরুরি।”
ডিবি পুলিশের বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, “ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করা হয় এবং অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে, আরও কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
প্রশ্ন উঠছে, ভেতরেই দুর্বলতা?
রাজধানীর মতো একটি উচ্চনিরাপত্তার শহরে এমন পদ্ধতিগত ছিনতাই শুধু সাধারণ অপরাধ নয়, বরং বড় ধরনের নিরাপত্তা দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়—মত বিশ্লেষকদের। প্রশ্ন উঠছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি আগাম গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে এমন চক্রের গতিবিধি শনাক্তে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ?
সূত্র জানায়, এই চক্রের আরও সদস্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তদন্তে উঠে আসতে পারে আরও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।