
নিজস্ব প্রতিবেদক
যুবদলের সদ্য ঘোষিত ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পদবঞ্চিত একদল নেতা। কমিটি গঠনে অনিয়ম, পদ বাণিজ্য, দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ তুলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তারা।
গত ৯ জুলাই রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ধানমন্ডিতে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির বাসভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান সংশ্লিষ্ট নেতারা।
সাক্ষাতে পদবঞ্চিত যুবদল নেতারা অভিযোগ করেন, সদ্য ঘোষিত কমিটিতে দলের দুঃসময়ের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অনেক নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়, অপরিচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তারা।
বৈঠকে উপস্থিত নেতারা এ্যানিকে জানান, কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, কমিটি পুনর্মূল্যায়ন করে প্রকৃত ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নেতারা আরও অভিযোগ করেন, সম্প্রতি যুবদল কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি জরুরি সভায় কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির বিষয় নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়।
তাদের দাবি, ওই সভায় কয়েকজন নবনিযুক্ত নেতার বিষয়ে আলোচনা হয় এবং তাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দায়িত্ব নির্ধারণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সভার কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলেও তারা দাবি করেন।
তবে ওই সভায় কী ধরনের আলোচনা হয়েছে বা সেখানে কার কী ভূমিকা ছিল—এ বিষয়ে যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পদবঞ্চিত নেতারা অভিযোগ করেন, কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজনের রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা দাবি করেন, এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য সামনে আনা প্রয়োজন।
বৈঠকে নেতারা কয়েকজন নবনিযুক্ত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।
তারা যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের প্রতি আহ্বান জানান, কমিটিতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের বিষয়ে সাংগঠনিকভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পদবঞ্চিত নেতারা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির কাছে দাবি জানান, দ্রুত একটি তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিটি পর্যালোচনা করা হোক এবং অনৈতিক পন্থায় পদ পাওয়ার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে ত্যাগী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
সূত্র জানায়, বৈঠকে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি নেতাদের বক্তব্য শোনেন এবং বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ড অবগত আছে বলে তাদের আশ্বস্ত করেন।
নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ্যানি বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক, মো. হুমায়ুন কবির, সাজ্জাদ হোসেন উজ্জ্বল ও জাকির হোসেন খান।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন যুবদলের সাবেক গ্রাম সরকারবিষয়ক সম্পাদক রিয়ন তালুকদার, ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান, যুবদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ মাসুদ, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম ফারুকসহ যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক নেতৃবৃন্দ এবং মহানগরের সাবেক নেতারাও ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত নেতারা জানান, তারা যুবদলের নতুন কমিটি নিয়ে নিজেদের আপত্তি ও উদ্বেগের বিষয়গুলো বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির কাছে তুলে ধরেছেন।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা অনেক নেতাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। একই সঙ্গে কমিটিতে স্থান পাওয়া কয়েকজনের রাজনৈতিক ভূমিকা ও সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পদবঞ্চিত নেতারা বলেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ত্যাগ, যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তারা দাবি করেন, এসব বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
তাদের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, কমিটি গঠনের পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে একটি সাংগঠনিক তদন্ত করা হোক। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
তথ্য বলছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে পদপ্রত্যাশী ও পদবঞ্চিতদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় থাকা নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। কমিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নিরসনে সাংগঠনিকভাবে অভিযোগ পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করারও অনুরোধ জানান। তারা এ বিষয়ে একটি স্মারকলিপি দেওয়ার সুযোগ চান।
নেতাদের দাবি, দলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে হলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে যুবদলের নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। পদবঞ্চিত নেতাদের অভিযোগ এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিএনপির হাইকমান্ড কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।