
নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, সদর ও রামগঞ্জ উপজেলায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শত শত গ্রাহক। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় অনেক বেশি বিল পাঠানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, বন্ধ থাকা সেচ মিটারেরও হাজার হাজার টাকার বিল এসেছে। আবার বিকাশে বিল পরিশোধের পরও পরের মাসে বকেয়া যোগ করে নতুন বিল পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধান মিলছে না। অফিস থেকে আগে বিল পরিশোধ করে পরে সমন্বয় (অ্যাডজাস্ট) করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
রায়পুর শহরের নতুনবাজার এলাকার ভাড়াটিয়া বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আকবর হোসেন সম্রাট বলেন, এপ্রিল মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৪ হাজার ৩৩৯ টাকা। মে মাসে একই বাসার বিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭৩৩ টাকায়। ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকলেও বিল দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেন দিনমজুর মাসুদ আলম। তিনি বলেন, তার সেচ মিটার গত দুই মাস ধরে বন্ধ থাকলেও ৬ হাজার ৪২১ টাকার বিল পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলেও অভিযোগের কার্যকর সমাধান পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
রায়পুর শহরের টিএনটি সড়কের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারী জসিম উদ্দিন বলেন, এপ্রিল মাসে ৩৫০ ইউনিট ব্যবহারের জন্য তার বিল এসেছিল ১ হাজার ৬৯০ টাকা। মে মাসেও প্রায় একই পরিমাণ ইউনিট ব্যবহার হলেও বিল এসেছে ৩ হাজার ১৯২ টাকা। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিল এত বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চান তিনি।
জসিম উদ্দিন বলেন, “ছোট একটি চাকরি করি। সংসারের ব্যয় সামলানোই কঠিন। এর মধ্যে এভাবে অতিরিক্ত বিল আসায় বড় সংকটে পড়েছি। সরকার যদি মানুষের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা না করে, তাহলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।”
শুধু এসব গ্রাহকই নন, শিক্ষক, সাংবাদিক, পুলিশ সদস্য, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রায়পুর এলএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, ছোট পরিবার হওয়ায় তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত। বাড়িতে গিজার বা প্রেসার কুকারের মতো উচ্চ বিদ্যুৎ-ব্যবহারকারী যন্ত্রও নেই। এরপরও মে মাসে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিল এসেছে।
নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী নজির আহাম্মদ জানান, এপ্রিল মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৯০০ টাকা। মে মাসে সেটি বেড়ে ৩ হাজার ২৫০ টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, “অফিসে গেলে আগে বিল দিতে, পরে সমন্বয় করা হবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু সবাই কি অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করার সামর্থ্য রাখে?”
মুদি ব্যবসায়ী মো. রাজু অভিযোগ করেন, তিনি বিকাশে নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও মে মাসে দ্বিগুণ বিল এসেছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন শহরের মীরগঞ্জ সড়কের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন হাওলাদার ও মিয়া রুবেল রহমান। তাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধের চাপ থাকলেও অতিরিক্ত বিলের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না।
এছাড়া কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, বিকাশে বিল পরিশোধের পরও পরবর্তী মাসে সেই বিল বকেয়া হিসেবে নতুন বিলে যুক্ত করা হয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ অফিসে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ভুলে অতিরিক্ত বিল হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে একই ধরনের অভিযোগ বারবার ঘটছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রায়পুর পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোশারফ হোসেন বলেন, “মিটার রিডিং না দেখেই অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কিছু ভুল হতেই পারে। কোনো গ্রাহকের বিলে সমস্যা থাকলে অফিসে অভিযোগ করলে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত গরম, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ফ্রিজ, ফ্যানসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র বেশি ব্যবহারের কারণেও অনেকের বিল বেড়েছে।”
পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, রায়পুর, পানপাড়া, রাখালিয়া ও হায়দরগঞ্জ জোনাল অফিসের আওতায় ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৭৯ হাজার ৯২২ জন এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক ৭ হাজার ৬৩৯ জন। গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে চারটি অভিযোগ কেন্দ্র চালু রয়েছে। তবে গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন নীতিগত কারণে নতুন মিটার সরবরাহ কার্যক্রমও সীমিত রয়েছে।