
ঢাকা জেলার রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, দলিল সম্পাদনে অনিয়ম এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠছে। তথ্য বলছে, জেলা রেজিস্ট্রারসহ গুলশান ও মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ ঘিরে পুরো রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানার সাব রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা আব্দুল কাদের এবং গুলশান থানার সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুন। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৩ মে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১০.৬৬ কাঠা জমির একটি সাব-কবলা দলিল সম্পাদন করা হয়, যার দলিল নম্বর ৩৪৫৯। সেখানে বাস্তবে জমিটি বসতভিটা হলেও দলিলে সেটিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি এবং দলিল সম্পাদনে চাপ প্রয়োগের ঘটনাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দাতা পক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দলিল সম্পাদনে বাধ্য করা হয়েছে এবং সরকারি রাজস্বের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা জেলার অন্তত ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রক্ষায় ভূমিকা রাখার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দলিল জালিয়াতির বিষয় ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের নকল নবিশ আওলাদ হোসেন গত দেড় বছর ধরে বালাম বইয়ে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করেননি। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তার বিরুদ্ধে সাব-রেজিস্টারের এজলাসে ওঠারও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া আব্দুল কাদের নিজ অর্থে কার্যালয়ে স্ক্যানার বসিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, রেকর্ড রুমে এ ধরনের স্ক্যানার স্থাপনের কোনো নিয়ম নেই। ওই স্ক্যানারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমির দলিল স্ক্যান করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে কীভাবে এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলো।
অন্যদিকে, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে দলিল সম্পাদনে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে। সূত্র জানায়, কিছু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্র দলিল প্রক্রিয়া দ্রুত করার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দালাল চক্রকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণেই সাধারণ সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ২০২৪ সালের একটি পৃথক অভিযোগে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ ও দলিল প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়, সেখানে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানার সাব-রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা আব্দুল কাদের এবং গুলশান থানার সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জেলা রেজিস্ট্রার মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে মাশোহারা নেওয়া, অডিটের নামে অর্থ আদায় এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বলছে, ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস পরপর অডিটের নামে একটি অফিস থেকেই ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো, যা ২১টি অফিস মিলিয়ে ১ কোটি ৫ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সাল থেকে তিনি ছুটিতে থেকেও প্রতি সপ্তাহে অফিসগুলো থেকে ১০ হাজার টাকা করে গ্রহণ করতেন। এছাড়া প্রতি মাসে প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। যদিও এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাব-রেজিস্ট্রার বলেন, আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ আদায়, দলিল গ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। তার দাবি, মোহাম্মদপুরের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদেরের সহযোগিতায় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা জেলা রেজিস্ট্রারকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে অফিসগুলোকে ‘ঘুষময় অফিসে’ পরিণত করেছে।
প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, রেজিস্ট্রেশন বিভাগে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৩৫টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালিয়েছিল, যেখানে দলিল রেজিস্ট্রি ও নকল উত্তোলনে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের ভেতরের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।