
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের খাবার সরবরাহ এবং অর্থ লোপাটের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠছে, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় আসার পর তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জরুরি বৈঠক করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে স্কুল ফিডিং প্রকল্পে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ, অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের কার্যাদেশ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে।
তথ্য বলছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেশের অন্তত ১১টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, শিশুদের জন্য বরাদ্দ ডিম, কলা ও বানরুটি সরবরাহে নিম্নমানের পণ্য দেওয়া হচ্ছে এবং এ খাতে প্রায় ১৭ কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের মেয়াদোত্তীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর কিংবা নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়েছে। কিছু এলাকায় খাবারের পরিমাণ কম দেওয়া এবং সরবরাহ তালিকার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ফলে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা।
একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, স্কুলে যে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে, তার মান নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। একজন অভিভাবক বলেন, “শিশুদের জন্য ভালো খাবারের কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক সময় নিম্নমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে। এতে বাচ্চাদের অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
প্রশ্ন উঠছে, প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ কীভাবে যাচাই করা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সরবরাহকৃত খাবার গ্রহণের আগে তা যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে দেশের প্রায় ১৫০ উপজেলায় স্কুল ফিডিং প্রকল্প চালু রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ে অভিযোগ উঠছে, কিছু এলাকায় নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা হচ্ছে না। কোথাও খাবারের মান খারাপ, কোথাও সরবরাহে অনিয়ম, আবার কোথাও বরাদ্দের তুলনায় কম পণ্য বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্কুল ফিডিং প্রকল্প শিশুদের পুষ্টি ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু এতে অনিয়ম হলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে।
একজন শিক্ষা বিশ্লেষক বলেন, “স্কুল ফিডিং প্রকল্প শুধু খাবার বিতরণ নয়, এটি শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখানে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “বড় প্রকল্পে দুর্নীতির ঝুঁকি থাকে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।”
এদিকে তদন্ত কমিটি গঠনের পর এখন নজর রয়েছে, অভিযোগের সত্যতা কতটা পাওয়া যায় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে শুধু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নয়, তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রকল্পে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে শিক্ষা ও পুষ্টি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই স্কুল ফিডিং প্রকল্পে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।