
বাংলাদেশে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন খাতে ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প নিয়ে একাধিক তদন্ত ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে গুরুতর ত্রুটির চিত্র উঠে এসেছে।
গত বছরের ৮ জুলাই একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথমবার প্রকল্পটির ভেতরের অনিয়মের বিস্তৃত চিত্র প্রকাশ পায়। “নজিরবিহীন অনিয়মের নজির জনস্বাস্থ্যের প্রকল্পে” শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত টুইন পিট ল্যাট্রিন, পাবলিক টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশনে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের ফলে অধিকাংশ স্থাপনা অল্প সময়েই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
এরপর বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর পরিদর্শনেও একই ধরনের চিত্র উঠে আসে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের অনেক অবকাঠামো ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত, কিছু স্থাপনা ভেঙে গেছে এবং বহু টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশন অচল অবস্থায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেক জেলায় টয়লেটের টাইলস ও ফিটিংস ভেঙে গেছে, টুইন পিট ল্যাট্রিনে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেট এমন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে যা ব্যবহার অনুপযোগী। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় বহু স্থাপনা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
পাবলিক টয়লেট ও পানির স্কিম নির্মাণেও গুরুতর ত্রুটির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে গেছে, কোথাও মেঝে দেবে গেছে। হাত ধোয়ার স্টেশনগুলোর অধিকাংশই অকেজো বা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—প্রকল্প বাস্তবায়নে মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদারদের অনিয়ম চিহ্নিত হলেও তা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করতে নিরুৎসাহিত করা হয়, ফলে বহু ক্ষেত্রে যাচাই ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই জলাশয় ভরাট করে নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে এবং নকশা উপেক্ষা করে পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। দুর্বল মনিটরিং ও যাচাইবিহীন বিল পরিশোধকে কেন্দ্র করে প্রকল্পটিকে “সরকারি অর্থ অপচয়ের বড় উদাহরণ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্পে ঠিকাদারদের ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে।
আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, অডিটে একাধিক আপত্তি উঠলেও তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। প্রকল্পের অনেক কাজ নির্ধারিত সময় শেষ হলেও অসম্পন্ন বা নিম্নমানের অবস্থায় রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আইএমইডির প্রতিবেদনে আংশিক চিত্র এসেছে। সব জায়গায় একই ধরনের অনিয়ম হয়নি। আমি কোনো অনিয়ম করিনি এবং কাউকে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিতে নিষেধ করিনি।”
তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অনিয়ম আড়াল করতে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং নেতিবাচক প্রতিবেদন দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আইএমইডির সুপারিশে বলা হয়েছে, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।