
চাঁদপুর, মতলব উত্তর
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ৬৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সুরক্ষা প্রকল্পে প্রায় ৮ কোটি টাকার কাজ ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফেরো সিমেন্টের স্ল্যাব নির্মাণে নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হয়নি, ফলে পুরো প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফরাজীকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নির্মাণাধীন এসব স্ল্যাবের কাজ করছে ‘আমিন এন্ড কোং’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে তথ্য বলছে, বাস্তবে কাজ পরিচালনায় অন্য ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন, যা কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রকল্প অনুযায়ী সিমেন্ট ও বালুর অনুপাত ৪:১ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় ৮:১ অনুপাতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। এতে স্ল্যাবের শক্তি ও স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দুই স্তরে তারের জাল ব্যবহারের কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কাজের শুরু থেকেই অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এই স্ল্যাব দিয়ে বাঁধ রক্ষা করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।”
প্রশ্ন উঠছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে তদারকি কোথায়? কেন নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হচ্ছে না? এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ভূমিকা পালন করছে?
এদিকে আরও অভিযোগ উঠছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ বাস্তবে পরিচালনা করছেন ‘আজিজ’ নামের একজন ব্যক্তি। সূত্র জানায়, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজের দায়িত্বে না থাকলেও মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক উপ-সহকারী প্রকৌশলী কাজটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। অভিযোগ উঠছে, তিনি ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকে কাজ তদারকি করছেন এবং অনিয়মের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
তবে অভিযুক্ত প্রকৌশলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ফরাজীকান্দির এই স্ল্যাব আমাদের কোনো প্রকল্পের আওতায় নয়। অভিযোগ পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।”
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা প্রকল্পটির বিষয়ে পরিষ্কারভাবে অবগত নন। কালীপুর সাব-ডিভিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “এই কাজ কারা করছে, সে বিষয়ে আমার কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।”
তথ্য বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে, যা তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারী পরিদপ্তর সম্প্রতি অভিযুক্ত এক প্রকৌশলীকে অন্যত্র বদলির নির্দেশ দিয়েছে। সূত্র জানায়, অভিযোগ ওঠার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই বদলি আদেশ প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই জেলায় দায়িত্ব পালনকারী কিছু কর্মকর্তা প্রভাব বিস্তার করে একটি ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেন্ডার ও কাজ বণ্টনে অনিয়ম হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিষয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার নামে বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেড়িবাঁধের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ল্যাব নির্মাণে সামান্য ত্রুটিও ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় নিম্নমানের কাজ হলে তা মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
একজন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ডিজাইন অনুযায়ী উপকরণ ব্যবহার না করলে স্ল্যাব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে পুরো বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।”
প্রশ্ন উঠছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন এই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে? তদারকি ব্যবস্থার ঘাটতি কোথায়? এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত কি হবে?
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দ্রুত একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি উদঘাটন করা জরুরি। অন্যথায় কোটি টাকার এই প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত ফল না দিয়ে বরং নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনমনে আস্থাহীনতা আরও বাড়বে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।