
উন্নত জীবনের আশায় সিঙ্গাপুর-এ পাড়ি জমানো বহু বাংলাদেশি প্রবাসীর অভিজ্ঞতায় এক ভিন্ন বাস্তবতা উঠে আসছে। অভিযোগ উঠছে, চাকরির প্রলোভন, আবাসন সুবিধা এবং দ্রুত আয়ের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে সংগঠিত প্রতারকচক্র বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
তথ্য বলছে, গ্রামাঞ্চলের স্বল্পশিক্ষিত ও নিম্নআয়ের তরুণরাই এসব প্রতারণার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। সহজে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ, উচ্চ বেতন এবং স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত একাধিক প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাকরির নামে প্রতারণা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। ভুয়া এজেন্ট বা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ নেওয়া হলেও বাস্তবে প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না।
নোয়াখালীর এক তরুণ মাইনুল হাসান মোহন (ছদ্মনাম) জানান, বিদেশে গিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় তিনি একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে যান। তার দাবি, “উচ্চ বেতন ও ভালো সুযোগের কথা বলে প্রায় আট লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এসে দেখি, আয়ের তুলনায় খরচই বেশি—ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “চুক্তির মেয়াদ এক বছর শেষ হওয়ার পর অনেককে নবায়ন না করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এতে করে নতুন করে আবার শ্রমিক আনার সুযোগ তৈরি হয়।”
সূত্র জানায়, কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অবস্থিত প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বিদেশি নিয়োগদাতাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভিযোগ রয়েছে। এতে করে একই পদ্ধতিতে ধারাবাহিকভাবে কর্মী এনে নির্দিষ্ট সময় পর ফেরত পাঠানোর একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সব ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি।
শুধু চাকরি নয়, আবাসন নিয়েও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। প্রবাসীরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম দামে রুম ভাড়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়। পরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে অভিযোগ।
এছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনাও উদ্বেগজনক। অভিযোগ উঠছে, ফোন বা বার্তার মাধ্যমে নিজেদের ব্যাংক কর্মকর্তা বা সরকারি প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আইনি ভয় দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতারকরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সদস্য পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখায়। “মামলা” বা “অবৈধ পার্সেল” সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে অর্থ দাবি করা হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে, এত ধরনের প্রতারণা চলতে থাকলেও ভুক্তভোগীরা কেন দ্রুত প্রতিকার পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক প্রবাসী আইনি জটিলতার ভয়ে বা তথ্যের অভাবে অভিযোগ করতে সাহস পান না।
এ বিষয়ে Ministry of Manpower-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে সব তথ্য যাচাই করা এবং বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য যেমন OTP, PIN বা Singpass কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের সহায়তায় Bangladesh High Commission Singapore থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারণার ধরন দিন দিন আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও জটিল হয়ে উঠছে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর নজরদারি এবং আইনি ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া এ ধরনের প্রতারণা রোধ করা কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—বিদেশে কর্মসংস্থানের এই বড় বাজারে কীভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে এবং প্রবাসীদের সুরক্ষা জোরদার করতে আর কী পদক্ষেপ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতা ও যাচাই-বাছাইই আপাতত সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।