
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় নলসোন্দা খালের ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতু ঘিরে অনিয়ম ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ৬৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার ব্রিজটির মাঝখানের গার্ডার ডেবে যাওয়ার পরও সেটি ঠিক না করে তার ওপরই স্টপ স্লাব ঢালাই দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সেতুটির কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, গার্ডার দেবে যাওয়ার পর তা সোজা বা প্রতিস্থাপন না করে “জোড়াতালি” দিয়ে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। এতে স্লাব উঁচু-নিচু হয়ে গেছে। তাঁদের আশঙ্কা, এ অবস্থায় ভারী যান চলাচল শুরু হলে সেতুটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কাজ অসম্পূর্ণ। সর্বশেষ সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ৪৪ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫ টাকা। পরে সংশোধিত ব্যয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭৬ টাকা। তবে কাজের ধীরগতির কারণে ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর মূল কাঠামোর কাজ আংশিক সম্পন্ন হলেও দুপাশের সংযোগ সড়ক ও রেলিং এখনো অসমাপ্ত। মাঝখানের একটি গার্ডার দেবে গিয়ে বাঁকা হয়ে আছে, যার ওপরই স্লাব ঢালাই করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নাজমুল হোসেন বলেন,
“শুরু থেকেই কাজের গতি খুব ধীর। মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ রেখে ঠিকাদার চলে যায়। আবার চাপ এলে কাজ শুরু হয়। এভাবে কাজ করতে গিয়ে গার্ডার দেবে গেছে।”
আরেক বাসিন্দা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন,
“এই ব্রিজ দিয়ে যদি ট্রাক বা ভারী যান চলে, তখন কী হবে—সেটা নিয়েই আমরা চিন্তায় আছি।”
দীর্ঘদিন কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভে এলাকাবাসী সেতুর ওপর অস্থায়ী দোকান বসিয়ে বাজার চালু করেছেন। প্রতিদিন সকালে সেখানে দুধসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “ব্রিজ আছে, কিন্তু কাজে লাগছে না। তাই আমরা নিজেরাই ব্যবহার করছি।”
সেতুটি চালু না হওয়ায় আশপাশের ১২ গ্রামের প্রায় দুই লাখ মানুষকে এখনো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্ষাকালে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকোই তাদের ভরসা। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
এক অভিভাবক বলেন,
“বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। সেতু থাকলে আমাদের এত কষ্ট করতে হতো না।”
নির্মাণকাজ করছে চট্টগ্রামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট সাব-ঠিকাদার মো. আনোয়ার হোসেন ফোনে বলেন,
“স্টপ স্লাবে কিছু ত্রুটি হয়েছে, তা ঠিক করে দেওয়া হবে। তবে গার্ডারে কোনো বড় সমস্যা নেই।”
তিনি আরও বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও মালামাল পরিবহনের সমস্যার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. শহিদুল্লাহ বলেন,
“গার্ডারে যে সমস্যা দেখা গেছে, তাতে সেতুর বড় কোনো ক্ষতি হবে না। কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।”
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গার্ডার সেতুর মূল কাঠামোগত অংশ। সেখানে ত্রুটি থাকলে তা শুধুমাত্র “সামান্য সমস্যা” হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রশ্ন উঠছে—গার্ডার দেবে যাওয়ার কারণ কী, ত্রুটি থাকা অবস্থায় কীভাবে স্লাব ঢালাই অনুমোদন পেল এবং প্রকল্প তদারকিতে কোথায় ঘাটতি ছিল।
নলসোন্দা খালের এই সেতুটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়—এটি হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, নির্মাণ ত্রুটি এবং তদারকির দুর্বলতার কারণে প্রকল্পটি এখন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত ত্রুটি সংশোধন করে নিরাপদভাবে সেতুটি চালু করা হোক—নইলে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।