
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চলতি অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে ইইউতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা প্রায় ৭ শতাংশের সমান।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ৭ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নে হয়। ফলে এই বাজারে এই ধরনের পতনকে খাত সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং খুচরা বিক্রিতে ধীরগতির কারণে পোশাকের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা তাদের মজুদ কমিয়ে নতুন ক্রয় কৌশল গ্রহণ করায় অর্ডারও কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধীরগতির মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন টেকসই উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব কারখানা এবং উচ্চ মূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম।
যুক্তরাজ্যেও একই সময়ে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে কানাডার বাজার প্রায় স্থিতিশীল, যেখানে হ্রাস হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ২৬ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারে, যেখানে রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাজারে প্রবেশে শুধু সম্ভাবনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিপণন কৌশল ও শক্তিশালী ক্রেতা সম্পর্ক।
পণ্যের ধরন অনুযায়ী নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা ও সাবেক বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “এটি সরাসরি সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক বাজার পুনর্বিন্যাসের প্রতিফলন। ক্রেতারা এখন সোর্সিং কৌশল বদলাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্যে উচ্চ মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভিয়েতনাম, ভারত ও তুরস্কের মতো দেশগুলো উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে নিতে পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ভবিষ্যতে আবারও নতুন প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।