
সংসদ ভবন | ঢাকা
দেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে জাতীয় সংসদে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই বিলের মাধ্যমে প্রায় দুই দশকের পুরনো আইনকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে টেকসই উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিলটির মাধ্যমে পূর্বে জারি করা ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’কে আইনে পরিণত করা হবে। সংশোধনের ফলে আইনের মূল উদ্দেশ্যে পরিবর্তন এনে দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগত মান, টেকসই উন্নয়ন এবং সর্বোত্তম মূল্য নিশ্চিত করার বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো আইনে ‘সাস্টেইনেবল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (এসপিপি)’ ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন ১৬ ধারায় টেন্ডার ডকুমেন্টে এমন কোনো শর্ত রাখার সুযোগ থাকবে না, যা পরিবেশের ক্ষতি করে বা শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘন করে, যেমন—ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুবিধা ও শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ।
আইনে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অংশ হিসেবে ‘রিভার্স অকশন’ পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে সরবরাহকারীরা কম দামে প্রতিযোগিতা করে দরপত্রে অংশ নেবে। এতে সরকারি ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সব সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পোর্টাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যতিক্রম হলে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি-এর পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বিপিপিএকে প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ‘ফিজিক্যাল সার্ভিসেস’কে আলাদা ক্রয় ক্যাটাগরি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে, যার মাধ্যমে একাধিক সরকারি সংস্থা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পূর্বনির্বাচিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সহজ করতে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোকে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন বা আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নিতে হবে।
দেশীয় আইটি খাত সুরক্ষায় বলা হয়েছে, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত আইটি সেবার আন্তর্জাতিক দরপত্রে স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যৌথ অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিলের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০০৬ সালের ৬ জুলাই প্রণীত আইনটি ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারি ক্রয়ে দক্ষতা, নৈতিকতা, গুণগত মান ও ব্যয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে নতুন সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগের আইনে মূল্যসীমা নির্ধারণের কারণে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় বিকল্প বিধান প্রয়োজন ছিল। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে নতুন কৌশল, সাস্টেইনেবল প্রকিউরমেন্ট, রিভার্স অকশন ও অবকাঠামোগত সেবাকে আলাদা খাতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৪ মে জারি করা ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। ওই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতেই বর্তমান বিলটি উত্থাপন ও পাস করা হয়েছে।