
ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। গত এক মাসে দেশটির শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য উধাও হয়েছে বলে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে দেশটির বিমান চলাচল, পর্যটন ও আবাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক মাসে দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে। একই সময়ে বাতিল হয়েছে ১৮ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট। দুবাইয়ের শেয়ারবাজার সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে, যেখানে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে সূচক কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ—যা আবুধাবির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দুবাইয়ের যুবরাজ শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল প্রচারণামূলক পদক্ষেপে অর্থনীতির আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে আরব আমিরাতের বহুমুখী অর্থনীতিতে। তেলনির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, আবাসন, লজিস্টিকস ও আর্থিক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করেছিল দেশটি। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এসব খাতই এখন ঝুঁকির মুখে।
মার্চ মাস পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। যদিও বেশির ভাগ প্রতিহত করা হয়েছে, তবুও আবুধাবি ও দুবাইয়ের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বুর্জ আল আরব, পাম জুমেইরাহ, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ফুজাইরাহর তেল শিল্পাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুবাইয়ের আবাসন খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে যেখানে লেনদেন ১৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল, সেখানে এখন বাজার দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। মার্চের শেষে রিয়েল এস্টেট সূচক কমেছে অন্তত ১৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৩৭ শতাংশ, আর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিক্রি অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
পর্যটন খাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে দুবাইয়ে ২ কোটির বেশি বিদেশি পর্যটক এলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদেশি নাগরিকদের ওপর কড়াকড়ির ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। হামলার ভিডিও ধারণের অভিযোগে কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে আটক করার খবর এসেছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এমন ভিডিও শেয়ার করলে বড় অঙ্কের জরিমানা বা কারাদণ্ড হতে পারে।
বিমান খাতেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ইরানি হামলার পর ১ মার্চ দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এক দিনেই চারটি বড় বিমানবন্দর থেকে ৩ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়। এমিরেটস ও ইতিহাদ এয়ারলাইনস সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করে।
হোটেল খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। আগাম বুকিং কমে যাওয়ায় অনেক হোটেল কক্ষভাড়া কমাতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু ধনী প্রবাসী দেশ ছাড়তে ব্যক্তিগত বিমানে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় দুবাইয়ের পর্যটন খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।