
উদয়ের পথে
গণপূর্তে ‘চার জনের বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট, ভাঙতে চান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলির নামে হয়রানি, কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি এবং প্রভাব খাটিয়ে পদায়নের অভিযোগ ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া চালু করে রেখেছিল।
তথ্য বলছে, একই দিনে ৫৭ জন প্রকৌশলীকে বদলির আদেশ জারি করার পর বিষয়টি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নজরে আসে। এরপর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ মার্চ পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব বদলির আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে কোনো ধরনের বদলি বা পদোন্নতি না দেওয়ার জন্য স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। এই নির্দেশনার পর প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ।
অভিযোগ উঠছে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে বদলি বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই সিন্ডিকেটে এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং একজন নারীসহ দুইজন নির্বাহী প্রকৌশলী সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন।
সূত্র জানায়, বর্তমান এক সচিবের ভাই ও শ্যালকের নামও এই সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ৩ মার্চ জারি করা এক আদেশে চুয়াডাঙ্গার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহসীনকে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী জেড়াল্ড অলিভার গুডাকে রিজার্ভে, নির্বাহী প্রকৌশলী (রিজার্ভ) মো. আতিকুল ইসলামকে মাগুরা, খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী সোমেন মল্লিককে রিজার্ভে বদলি করা হয়।
এ ছাড়া প্রেষণ থেকে প্রত্যাগত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিয়াদুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (সংস্থাপন) দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে রিজার্ভের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুস্তাফিজুর রহমানকে গাইবান্ধা গণপূর্ত বিভাগে এবং প্রেষণ প্রত্যাগত শাহিনুর ইসলামকে চুয়াডাঙ্গা গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন করা হয়।
প্রশাসনিক নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, একই দিনে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের তিনটি পৃথক আদেশে একাধিক বদলি কার্যকর করা হয়। এর মধ্যে গণপূর্ত প্রকল্প বিভাগ-৫ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিমেল দাসকে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৩ এ এবং গণপূর্ত প্রকল্প বিভাগ-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সুষমা আপ্লুত আরা ফেরদৌসকে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৭ এ বদলি করা হয়।
এ ছাড়া নরসিংদী গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদ আল আজাদকে মিরপুর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১ এ, রংপুর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হুসাইন মো. সাফী মণ্ডলকে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এ এবং বগুড়া গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামকে ঢাকা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৫ এ বদলি করা হয়।
৩ মার্চ আরেকটি আদেশে আরও আট উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। এতে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁ, খাগড়াছড়ি ও মিরপুরসহ বিভিন্ন দপ্তরে পদায়ন পরিবর্তন করা হয়।
একই দিনে তৃতীয় প্রজ্ঞাপনে সাতজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর বদলি করা হয়। এর মধ্যে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-৪ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান মজুমদার, গণপূর্ত জরিপ উপ-বিভাগ-২ এর অসীম চন্দ্র স্বর্ণকার এবং পটুয়াখালী গণপূর্তের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পিন্টু তালুকদারসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা রয়েছেন।
একই দিনে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও দুটি পৃথক আদেশ জারি করা হয়। এক আদেশে ৯ জন এবং অন্য আদেশে ২ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।
বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মানিকগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হোসাইন মোহাম্মদ শাহরিয়ার, প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে সংযুক্ত মো. নাজমুল হোসাইন, ঝালকাঠি গণপূর্ত বিভাগের মো. আতিকুর রহমান খাঁ, বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের মো. রফিকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের মো. গোলাম মুনহাম জোয়ার্দ্দারসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা।
এ ছাড়া পৃথক আদেশে খুলনা গণপূর্ত জোনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান এবং রাঙ্গামাটি গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. আতাউর রহমানকেও বদলি করা হয়।
একই দিনে আরও ১১ জন চলতি দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলীকেও বিভিন্ন দপ্তরে বদলি করা হয়।
প্রশাসনিক মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, এত বড় পরিসরে হঠাৎ বদলির আদেশ জারি হওয়ায় অধিদপ্তরের ভেতরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। অভিযোগ উঠছে, এই বদলি প্রক্রিয়ার পেছনে আর্থিক লেনদেন ও প্রভাবশালী মহলের তদবির কাজ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন সংস্থায় যদি বদলি প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন ওঠে, তবে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য উদ্বেগজনক।
এ বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
তবে একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন যে, মন্ত্রীর নির্দেশে বদলির আদেশগুলো বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, মন্ত্রী ধীরে চলতে বলেছেন এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করা হচ্ছে।