
প্রবাসী ও ‘ভূতুড়ে’ নামে চাল আত্মসাৎ, প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত
উদয়ের পথে
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা-র মজিদবাড়িয়া ইউনিয়ন-এ জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ৬ নম্বর মজিদবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহ শানু মোল্লা ও ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মুনসুর হেলাল-এর যোগসাজশে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের বঞ্চিত করে প্রবাসী ও ‘ভূতুড়ে’ ব্যক্তিদের নামে চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মজিদবাড়িয়া ইউনিয়নে ২৯২ জন জেলের জন্য জনপ্রতি ৮০ কেজি করে মোট ২৩.৩৬ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১ মার্চ (রবিবার) ওই চাল বিতরণ করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বিধান উপেক্ষা করে চেয়ারম্যান ও সচিব নিজেদের সুবিধামতো একাধিক তালিকা তৈরি করে চাল আত্মসাৎ করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকার ২৭০ থেকে ২৯২ নম্বর ক্রমিক পর্যন্ত ২২ জন ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে জেলে নন। তালিকার ২৮২ ও ২৮৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা হানিফ মোল্লা ও সেলিম মীর জানান, তারা মৎস্যজীবী নন এবং তাদের অজান্তেই তালিকায় নাম দিয়ে চাল উত্তোলন করা হয়েছে।
৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রকৃত জেলে ইয়াসিন অভিযোগ করেন, তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও তাকে চাল দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, সচিব মুনসুর হেলাল তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। এ বিষয়ে স্থানীয় জেলে শহিদ হাওলাদার বলেন, সচিবের বাধার কারণেই ইয়াসিন চাল পাননি। একই অভিযোগ রয়েছে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ধলু মিয়ার ক্ষেত্রেও।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার জাফর মল্লিক জানান, তার ওয়ার্ডে তিনি ৪৪ জন জেলের তালিকা দিয়েছেন। কিন্তু উপজেলা মৎস্য কার্যালয় থেকে ৮৫ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছে। তালিকায় থাকা অনেকেই প্রকৃত জেলে নন, আবার প্রকৃত অনেক জেলে বাদ পড়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডে মৎস্যজীবীদের তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাড়া বাকি দুই ওয়ার্ডের মেম্বার জুলাই বিপ্লবের পর থেকে পলাতক রয়েছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন চেয়ারম্যান ও সচিব।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে ঢাকায় অবস্থানরত শ্রী মাখম চন্দ্র দাস ও তাঁর ছেলে স্বপন চন্দ্র দাস-এর নামে চাল উত্তোলন করা হয়েছে। তারা জেলে নন এবং তাদের অজান্তেই এই চাল তোলা হয়েছে। এছাড়া মাখম চন্দ্র দাসের পুত্র হিসেবে ‘জব্বার’ নামে এক কাল্পনিক ব্যক্তির নাম তালিকায় যুক্ত করে চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নশা হাওলাদার প্রবাসে থাকলেও তাঁর নামেও সরকারি চাল উত্তোলন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চাল আত্মসাতের পাশাপাশি ভিজিডি কার্ড করে দেওয়ার নামেও ঘুষ নেওয়া হয়েছে।
৫ নম্বর ওয়ার্ডের জাকির হোসেন ও জলিল হাওলাদার অভিযোগ করেন, ভিজিডি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে চেয়ারম্যান তাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নিয়েছেন। চেয়ারম্যানের বাড়িতে তাঁর স্ত্রীর সামনেই টাকা দেওয়া হলেও এক বছর পার হলেও তারা কোনো কার্ড পাননি। স্থানীয়দের দাবি, সচিব মুনসুর হেলালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে দেউলী সুবিদখালী ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ছিল।
এছাড়া সদ্য বিদায়ী এক উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও স্থানীয়রা দাবি করেছেন। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দুর্নীতির একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে টানা দুই দিন সচিব মুনসুর হেলালের কক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। তাকে ৩০ বারের বেশি ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি বা ফেরত দেননি।
পরে উপজেলা প্রশাসনের চাপের মুখে দুই দিন পর তিনি ফোন করে বলেন, তিনি টানা অফিস করেছেন এবং তার কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল না। তবে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত পরিষদে অবস্থান করেও সাংবাদিকরা তার কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখেছেন বলে দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, “আমি এখানে যোগদান করেছি দুই মাস হয়েছে। তালিকাটি মৎস্য অফিস থেকে করা হয়েছে। প্রত্যেক ওয়ার্ডের মেম্বার জানেন। আমি তালিকা অনুযায়ী চাল বিতরণ করেছি। অন্যদিকে চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহ শানু মোল্লার সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দেখা হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে কোনো বক্তব্য না দিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে চলে যান।
পরে মোবাইল ফোনে তিনি কিছু অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন,
“আমি অসুস্থ হয়ে ঢাকায় ছিলাম। কাগজ সচিবের কাছে দিয়ে গেছি, তিনি কী করেছেন জানি না।”
আরও অনিয়মের কথা জানালে তিনি বলেন, “এসব নিয়ে আমি ভাবি না, আপনাদের যা করার করেন।”
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান জানান, ২৯২ জন জেলের জন্য চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে মোসাঃ মলিহা খানম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), বলেন—
“আমি অবশ্যই বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করব। প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জন্য যে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনো অনিয়ম থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।”
-