উদয়ের পথে
ঈশ্বরগঞ্জ–মধুপুর ও হোসেনপুর–দেওয়ানগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে ৭০১ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি দুটি প্যাকেজে বিভক্ত করে কাজ চললেও মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি, ভূমি অধিগ্রহণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ বণ্টন ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তথ্য বলছে, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও সম্ভাব্য অনিয়ম জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
প্রকল্পের প্যাকেজ–০১ ও প্যাকেজ–০২ মিলিয়ে সড়ক প্রশস্তকরণ, মজবুতিকরণ, নতুন সড়ক নির্মাণ, সারফেসিং, রিজিড পেভমেন্ট, সেতু, কালভার্ট, আরসিসি ইউ-ড্রেন ও প্যালাসাইডিংসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব কাজের গতি ও মানের ফারাক ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
মনিটরিং টিমের পরিদর্শনকালে কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, দুটি প্যাকেজের আওতায় এখন পর্যন্ত সীমিতসংখ্যক কালভার্ট সম্পন্ন হয়েছে এবং সোল্ডারে মাটি ভরাটের কাজ চলমান। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, মাটি ভরাটের পর পর্যাপ্ত কম্প্যাকশন না থাকলে ভবিষ্যতে সড়কের স্থায়িত্ব কতটা টেকসই হবে?
বিশেষ করে বাজার এলাকায় ৫০০ মিটার রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণ শেষ হলেও সেখানে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। মনিটরিং টিম এ অবস্থাকে “পরিকল্পনার ঘাটতির স্পষ্ট উদাহরণ” হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত ড্রেনেজ পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
প্যাকেজ–১ এর আওতায় নির্মাণাধীন পিসি গার্ডার সেতুর অ্যাবাটমেন্ট ওয়াল সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে প্যাকেজ–২ এ বিদ্যমান বেইলি সেতুর স্থলে নতুন সেতুর পাইলিং কাজ চলমান। মনিটরিং টিম নির্দেশ দিয়েছে, নির্মাণকাজ চলাকালে বেইলি সেতু সচল ও রক্ষণাবেক্ষণে রাখতে হবে। সূত্র জানায়, এই নির্দেশনা মানা না হলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাঁক সরলীকরণ ও নতুন সড়ক নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ অত্যাবশ্যক হলেও এখানেই সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি হয়েছে। কিশোরগঞ্জ অংশে দুটি ভূমি অধিগ্রহণ মামলা চলমান, যৌথ তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। ময়মনসিংহ অংশে ডিএলএসি সভা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে।
মনিটরিং টিম দ্রুত সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও হোসেনপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে সওজকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হলেও হোসেনপুর নতুন বাজার এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো দৃশ্যমান সমাধান হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সওজের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভূমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়াকেই কাজ বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে তাঁদের বক্তব্যে নির্দিষ্ট সময়সীমা বা দায় স্বীকারের স্পষ্টতা নেই। প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবের দায় কে নেবে?
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বণ্টন নিয়ে। এলাকাবাসীর দাবি, একই দাগ নম্বরের জমিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্ন মানের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। কোথাও তিনতলা ভবনের পূর্ণ বিল দেওয়া হলেও অন্যত্র একই ধরনের স্থাপনার জন্য অসম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। তথ্য বলছে, একাধিক ভুক্তভোগী একই দাগে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল নয়—বরং সংগঠিত অনিয়ম ও সম্ভাব্য দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূমি অধিগ্রহণে পুনঃতদন্ত ও ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ এবং প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত ৭০১ কোটি টাকার এই প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন একটাই—
এটি কি সত্যিই জনস্বার্থে উন্নয়ন, নাকি সীমিত কিছু মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টির আরেকটি উদাহরণ?
অনুসন্ধান বলছে, এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য সামনে আসতে পারে, যা অভিযোগের গভীরতা নতুন মাত্রা দেবে।