
নিজস্ব প্রতিবেদক
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা–কর্মচারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ–দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া বিল–ভাউচার তৈরির অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগের তালিকায় সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন পিরোজপুর সওজ বিভাগের বিভাগীয় হিসাব রক্ষক মো. জাকির হোসেন এবং তার স্ত্রী খুলনা বিভাগের নকশাকার রত্না সুলতানা।
অভিযোগ অনুযায়ী, সীমিত আয়ের সরকারি চাকরি করেও তারা অস্বাভাবিক পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। বাড়ি–গাড়ি, জমি–ফ্ল্যাটের পাশাপাশি একটি ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার কেনার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে, যা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের মৃত দেলোয়ার হোসেনের পুত্র জাকির হোসেন কর্মজীবন শুরু করেন মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (এজি) কার্যালয়ে। ওই সময়কার কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে নথি আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ শোনা যেত।তাদের ভাষ্য, তিনি বাইরে ভদ্র, কিন্তু ভেতরে ভয়ংকর—এমন সুনামই ছিল। তবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় অভিযোগগুলো কখনো দৃশ্যমান তদন্তে গড়ায়নি।
২০১৮ সালে জাকির হোসেনকে পিরোজপুর সওজ বিভাগে বিভাগীয় হিসাব রক্ষক হিসেবে বদলি করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এখানে যোগদানের পর তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়।
সূত্র জানায়, তৎকালীন কয়েকজন ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুয়া বিল, অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো ও অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে পূর্ণ বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠছে। এসব বিল ছাড়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে হিসাব শাখার ভূমিকা থাকায় জাকির হোসেনের নাম বারবার সামনে আসছে।
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক কর্মকর্তা বদলি বা আত্মগোপনে গেলেও জাকির হোসেন এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। এতে প্রশ্ন উঠছে—তিনি কীভাবে সব অভিযোগের মধ্যেও টিকে আছেন?
একাধিক সূত্র বলছে, প্রভাবশালী মহলকে সন্তুষ্ট রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে, যদিও এসব দাবি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয়।
২০২৪ সালে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়—জাকির হোসেন ব্যক্তিগত অর্থে একটি হেলিকপ্টার কিনেছেন। এই তথ্য সামনে আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠায়।
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যগুলো আমাদের অনুসন্ধানে সহায়ক। অভিযোগের সত্যতা মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানী তথ্য বলছে, জাকির হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অভিযোগে যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে—
খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকায় একাধিক আলিশান বাড়ি। খালিশপুর এলাকায় শ্বশুরবাড়ির নামে জমি ও স্থাপনা
বরগুনা–বামনায় জমি ও সম্পত্তি।রাজধানীর ধানমন্ডি, রামপুরা, বনশ্রী ও উত্তরা এলাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট।পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক গাড়িও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ।
অথচ তথ্য বলছে, জাকির হোসেনের মাসিক বেতন প্রায় ৬০ হাজার টাকা, যা দিয়ে এ পরিমাণ সম্পদ অর্জন আইনগতভাবে সম্ভব কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী রত্না সুলতানার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। দপ্তর থেকেও কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে কয়েকজন সাংবাদিককে হুমকি ও আর্থিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুর জেলার একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কয়েকজন মামলার আসামির নামও আলোচনায় এসেছে। যদিও এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সওজের মতো বড় দপ্তরে হিসাব শাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির অবস্থান থাকলে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। তারা বলছেন, সম্পদের উৎস যাচাই, জীবনযাত্রার মান এবং আয়–ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণই এ ধরনের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারে।
জাকির হোসেন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুতর হলেও এখনো তদন্তাধীন। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে অনুসন্ধান ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তবে প্রশ্ন উঠছে—এই অনুসন্ধান কত দ্রুত, কতটা নিরপেক্ষ ও কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষা ও জনআস্থা রক্ষায় অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে।