
নিজস্ব প্রতিবেদক |
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে যিনি নিজেকে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের গণপূর্ত অধিদপ্তরের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নিয়মিত ছবি পোস্ট করতেন—সেই প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরী এখন ইএম সার্কেল–৩-এর দায়িত্বে। রাজনৈতিক অবস্থান ও পরিচয়ে এই হঠাৎ পরিবর্তনের পরই তাঁর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন ও সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে ‘লাভজনক’ পোস্টিং হিসেবে পরিচিত ই/এম সার্কেল–৩-এর দায়িত্ব পান। এরপর থেকেই সরকারি প্রকল্প কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জমা হতে থাকে বিভিন্ন দপ্তরে।
তথ্য বলছে, মাহবুবুল হক চৌধুরী রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ১/১৪ ইকবাল রোডে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক। এ ছাড়া পশ্চিম আগারগাঁওয়ের ৬০ ফুট রাস্তার মাথায় তাঁর চারতলা একটি ভবন রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বনশ্রী আমুলিয়া হাউজিং এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমির মালিকানার তথ্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবনের স্বীকৃত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো যৌক্তিক সঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে এবং অনিয়মের মাধ্যমেই এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ই/এম সার্কেল–৩-এর আওতাধীন বিভিন্ন টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় মাহবুবুল হক চৌধুরীর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ঠিকাদারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে।
সূত্রগুলো আরও জানাচ্ছে, প্রকল্পের কাজের বিল পরিশোধ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে অভিযোগে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট চক্র সুবিধা পাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, একটি প্রকল্পেই ১৭ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৪৪ টাকার বিলে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি জাল ওয়ার্ক সার্টিফিকেট ব্যবহার করে তাঁর সার্কেলের আওতায় কাজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারী একাধিক ঠিকাদার দাবি করেছেন, নিয়ম মেনে দরপত্রে অংশ নিলেও প্রভাবশালী একটি চক্রের কারণে তাঁরা কাজ পাচ্ছেন না। এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। আমরা কাগজপত্র ঠিক রেখেও কাজ পাই না। ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার ছাড়া এখানে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।”
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী বলেন,
“এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা হওয়া উচিত। সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম হলে রাষ্ট্র সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
একজন অভিজ্ঞ ঠিকাদার বলেন,
“গণপূর্তের কাজ মানেই বড় অঙ্কের অর্থ। এখানে স্বচ্ছতা না থাকলে শত শত কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য মাহবুবুল হক চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ঠিকাদার দুলাল ও সায়মন বলেন,
“তিনি গণপূর্তের প্রচলিত নিয়ম মেনেই কাজ করছেন। অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়।”
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন,
“কোনো সরকারি কর্মকর্তার আয় ও সম্পদের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আমরা প্রাথমিক যাচাই করি। প্রমাণ মিললে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয় এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
বৃহস্পতিবার দুদকের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে, মাহবুবুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হতে পারে।
একজন সরকারি প্রকৌশলীর স্বীকৃত আয়ের সঙ্গে যদি এত বিপুল সম্পদের ব্যবধান থাকে, তাহলে সেই অর্থের উৎস কী? ই/এম সার্কেল–৩-এর টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? প্রভাবশালী ঠিকাদার চক্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ কতটা সত্য—এমন একাধিক প্রশ্ন এখন প্রশাসনিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
দুদকের তদন্তে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা বেরিয়ে আসবে কি না, সে দিকেই এখন তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল।