
স্টাফ রিপোর্টার |
নেটওয়ার্ক মান, ইন্টারনেট গতি ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস নিয়ে নাগরিকদের বিস্তর অভিযোগ
বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতের মানোন্নয়ন ও সেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ শুনতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন–বিটিআরসি এবার প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ অনলাইনে ষষ্ঠতম বার্ষিক গণশুনানি–২০২৫ আয়োজন করেছে। রাজধানীর রমনা এলাকায় অবস্থিত বিটিআরসির প্রধান কার্যালয় থেকে দেশীয় ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম ‘কনভে’ ব্যবহার করে এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
বিটিআরসি জানায়, অনলাইন ব্যবস্থার কারণে ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত জেলা ও উপজেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি যুক্ত হন। অংশগ্রহণকারীরা মোবাইল নেটওয়ার্কের মান, কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতি, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভিএএস), অবাঞ্ছিত প্রচারণামূলক এসএমএস, ডেটা প্যাকের মূল্য ও বৈচিত্র্য, গ্রাহকসেবার জটিলতা এবং গ্রামীণ–শহুরে নেটওয়ার্ক বৈষম্য––এমন বহুবিধ অভিযোগ ও মতামত উপস্থাপন করেন।
নেটওয়ার্ক মান, কলড্রপ ও ডেটার গতি—অভিযোগের কেন্দ্রে মোবাইল অপারেটররা
অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগ প্রশ্নই ছিল মোবাইল সেবার মান নিয়ে।
অনেকে অভিযোগ করেন—একাধিক অপারেটর ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত নেটওয়ার্ক পাই না।
কলড্রপ বেড়েছে, বিশেষত অফিস–আদালত এলাকায়।4G নামেই আছে, কিন্তু গতি 3G–এর চেয়েও কম।
গ্রামীণ এলাকার অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শহর-নগরের তুলনায় নেটওয়ার্ক গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম, অনেক স্থানে এখনো নিরবচ্ছিন্ন 4G কাভারেজ নেই।
অসংখ্য অংশগ্রহণকারী অভিযোগ করেন—অনুমতি ছাড়া ভিএএস চালু হয়ে টাকা কেটে নেওয়ার ঘটনা এখনো কমেনি,প্রচারমূলক এসএমএস বন্ধ করার পরও অনেকে বার্তা পেয়ে চলেছেন।অপারেটরদের গ্রাহকসেবা পাওয়াকে “ঝামেলাপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ” বলে অভিযোগ করেন।
এক অংশগ্রহণকারী মন্তব্য করেন—দাম বাড়ে, কিন্তু সেবা বাড়ে না—সেটাই সবচেয়ে হতাশার।
গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান, বিভিন্ন বিভাগের সদস্য, মহাপরিচালক, পরিচালক এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তারা।বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগের জবাব দেন।কমিশন জানায়—সব প্রশ্ন নথিভুক্ত করা হয়েছে,ভবিষ্যৎ নীতি ও বিধিমালায় অভিযোগগুলোর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে,অপারেটরদের সেবার মান নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হবে।
গণশুনানির পুরো প্রযুক্তিগত কার্যক্রম পরিচালনা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি পিএলসি, যারা ‘কনভে’ প্ল্যাটফর্মটি উদ্ভাবন করেছে।প্রযুক্তিগত আয়োজকরা জানান—পুরো সেশনজুড়ে অডিও–ভিডিও সংযোগ ছিল স্থিতিশীল।বক্তা নির্বাচন, কিউ–ম্যানেজমেন্ট, মাইক্রোফোন নিয়ন্ত্রণ ও সময় ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্ল্যাটফর্মেই সম্পন্ন হয়েছে।সেশনটি রেকর্ড করা হয়েছে পরবর্তী বিশ্লেষণের জন্য।
এটি বাংলাদেশের সরকারি সংস্থার প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন গণশুনানি হওয়ায় প্রযুক্তি খাতে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সিনেসিস আইটি জানায়, প্ল্যাটফর্মটি সম্পূর্ণভাবে দেশের ভেতর অবস্থিত নিরাপদ অবকাঠামোতে পরিচালিত হয়। এর ফলে—রাষ্ট্রীয় ডেটার সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত থাকে,তথ্য থাকে দেশের মাঝেই সংরক্ষিত, বড় আকারের সভায় কয়েক হাজার অংশগ্রহণকারী একসঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
প্ল্যাটফর্মটিতে রয়েছে—এন্ড–টু–এন্ড এনক্রিপশন,মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন,ভূমিকাভিত্তিক অ্যাকসেস কন্ট্রোল চ্যাট, লগ ও অডিও–ভিডিও রেকর্ডিং সুবিধা।
সিনেসিস আইটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়—
“বড় আকারের সরকারি সভা, গণপরামর্শ বা নীতি সংলাপ সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তির ওপর আস্থা বাড়ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনা বাংলাদেশের সরকারি সংস্থার ডিজিটাল পরামর্শ ব্যবস্থায় একটি নতুন ধাপ চিহ্নিত করেছে। তাঁদের বিশ্লেষণে— অনলাইন ব্যবস্থার কারণে বেশি মানুষ অংশ নিতে পেরেছেন
ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল সবচেয়ে সমন্বিত অংশগ্রহণ,নীতি–নির্ধারণে নাগরিক মতামতের বিস্তৃতি বাড়তে পারে। এক বিশেষজ্ঞ বলেন : সরকারি খাতে অনলাইন গণশুনানির সংখ্যা বাড়লে সেবা উন্নয়নে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
বিটিআরসির গণশুনানি–২০২৫ কেবল অভিযোগ শুনানির একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি দেশের টেলিযোগাযোগ সেক্টরের সার্ভিস কোয়ালিটি নিয়ে নাগরিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম হয়ে উঠেছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘কনভে’ ব্যবহার করে পুরো সেশন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে অন্য সরকারি সংস্থাও অনুরূপ ডিজিটাল গণশুনানি আয়োজনের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকেরা।