
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, :
বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিরুদ্ধে এনআরবিসি ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ
দুদকের তলব, ব্যাংক অনিয়মের নথি ও বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভে প্রশ্নের মুখে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক
পুঁজিবাজারের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ব্যাংক ঋণ অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তথ্য বলছে, একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে তিনি শত শত কোটি টাকার বিতর্কিত ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন।
সূত্র জানায়, এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২৬৪ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতিতে তাঁর সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে দুদক। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি তাঁকে ৩ থেকে ৪ বার তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তিনি চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর প্রতিবাদে বিএসইসি চেয়ারম্যানের অপসারণ ও দ্রুত তদন্তের দাবিতে দুদক কার্যালয় ও মতিঝিল এলাকায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ একাধিকবার বিক্ষোভ করেছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, “যিনি নিজেই গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত, তিনি পুরো পুঁজিবাজার কীভাবে নৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন—এই প্রশ্ন এখন সবার।
তথ্য বলছে, খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ছিলেন বিতর্কিত এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। সে সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল, ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মিয়া আরজু এবং এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমামের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ আর্থিক দুর্নীতি চক্র সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠছে, ওই চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে রাশেদ মাকসুদ বরং সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তাঁর দায়িত্বকালে এ অ্যান্ড আউট ওয়্যার লিমিটেড, নর্ম আউট লিমিটেড ও কোল্ড প্রে লিমিটেড নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জয়নাল আবেদীনকে অবৈধভাবে ২৬৪ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। এই ঋণ অনিয়মের তদন্ত বর্তমানে দুদকের কাছে চলমান।
দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের ২০২৩ সালের ১১ জুন জারিকৃত এক স্মারকে (নং: ০০.০১.১৫০০.৭১৩.০১.০২৬.২০২০-১০৬৫) উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক কর্মকর্তাদের জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে জয়নাল আবেদীন ২৬৪ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে বিদেশে পাচার করেছেন—এমন অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। সে সময় এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ।
প্রশ্ন উঠছে, এমন একজন ব্যক্তি কীভাবে পরবর্তীতে দেশের পুঁজিবাজারের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিয়োগ পেলেন?
‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা’ দেওয়ার অভিযোগ, তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে এনআরবিসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ ব্যক্তিদের মালিকানায় গঠিত হয় এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, সরঞ্জাম ক্রয়, শাখা-উপশাখা ডেকোরেশন ও গাড়ি ভাড়ার কাজ একচেটিয়াভাবে এই প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়।
সূত্র জানায়, ব্যাংকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই কোম্পানিকে ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৭৮তম বোর্ড সভায় রাশেদ মাকসুদের সুপারিশে ৬০ কোটি টাকার কম্পোজিট ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। যা ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন বিধি’র পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ব্যক্তি ব্যাংক ও সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক হলে সেখানে স্বচ্ছতা থাকে না—এটি সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত।
তথ্য বলছে, ব্যাংক চেয়ারম্যান পারভেজ তমালের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লান্তা সার্ভিসেস লিমিটেডকে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও ২০১৯ সালে একের পর এক বিশেষ সুবিধায় ঋণ দেওয়া হয়। এমনকি কোন পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ৪.৫০ কোটি টাকা, পরে ৬.৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত কম্পোজিট ক্রেডিট লিমিট বৃদ্ধি করা হয়।
এছাড়া ১.৬০ কোটি টাকা ও পরে ২.৪২ কোটি টাকার হায়ার পারচেজ ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে বিলাসবহুল ল্যান্ড রোভার গাড়ি কেনা হয় বলে নথিতে উঠে এসেছে।
প্রশ্ন উঠছে, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিজেই উপস্থিত থেকে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যালকনি ত্যাগ করলেন না কেন?
পাপারোম্রা ঋণ কেলেঙ্কারি ও জমি কারসাজি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাবনার রূপপুর শাখার গ্রাহক পাপারোম্রাকে ৫ কোটি টাকার ওভারড্রাফট ঋণ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, যে জমিকে জামানত দেখানো হয়, সেটি ঋণ ছাড়ের পর ক্রয় করা হয়—যা আইন ও সুশাসনের সরাসরি লঙ্ঘন।
সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষায় অনিয়মের প্রমাণ মিললেও সে সময় কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. রুহুল আমিন আকন্দ বলেন,
“দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন একজন ব্যক্তি নৈতিকভাবে বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে থাকতে পারেন না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত তদন্ত করে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ বলছে, বর্তমান কমিশনের অধীনে বাজারে আস্থা আরও দুর্বল হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিএসইসি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান—এখানে সন্দেহমুক্ত, সৎ ও পেশাদার নেতৃত্ব ছাড়া বাজার স্থিতিশীল রাখা অসম্ভব।
তথ্য বলছে, খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল অতীতশৈলীর নয়, বরং বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজার, বিনিয়োগকারীর আস্থা ও আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দুদকের তদন্ত কোন দিকে যায় এবং সরকার এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।