
বিশেষ প্রতিবেদন
৮১৬ কোটি টাকা আত্মসাতে হেমায়েত উল্লাহ গ্রেপ্তার—প্রশ্নের মুখে নজরুল–খালেক চক্র
রাজধানীর আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম-অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে ঘিরে আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে। কোম্পানির সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হেমায়েত উল্লাহকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে নতুন করে সামনে এসেছে বহু কোটি টাকার দুর্নীতির জটিল চিত্র। তথ্য বলছে, এই এক মামলাতেই ৮১৬ কোটি টাকার অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে, আর সামগ্রিকভাবে অনিয়মের পরিমাণ অতিক্রম করেছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
ডিবি সূত্র জানায়, কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক এম এ খালেক এবং সিইও হেমায়েত উল্লাহ—এই ত্রয়ী দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে অপারদর্শী লেনদেন ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেন। সূত্র জানায়, তাদের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ, নীতি লঙ্ঘন ও অর্থ স্থানান্তর নিয়মিতভাবে চলত, যার বেশিরভাগই দীর্ঘদিন আড়ালে ছিল।
প্রশ্ন উঠছে—প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এত বড় অঙ্কের অর্থ ঠিক কীভাবে বছর বছর বাইরে চলে গেল?
৮১৬ কোটি টাকার মামলার পটভূমি
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কোম্পানির আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন শাহবাগ থানায় যে মামলাটি করেন, তাতে হেমায়েত উল্লাহকে প্রধান আসামি করে উল্লেখ করা হয় যে, কোম্পানির প্রিমিয়াম, বিনিয়োগ ও গ্রাহকের তহবিল থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ সরানো হয়েছে। এই মামলাটিই বর্তমানে ডিএমপির ডিবি তদন্ত করছে।
গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ডিবি হেমায়েত উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাকে আদালতে তোলা হলে বিচারক তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ডিবি কর্মকর্তারা জানান, এর আগে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, যা তদন্তের অগ্রগতিতে নতুন দিক খুলে দিতে পারে।
তথ্য বলছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফে শুধু এই মামলার ৮১৬ কোটি নয়—এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠান থেকে ২,৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এ ছাড়া ৪৩২ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্তরে চাপা ছিল, যা এখন তদন্তে পরপর বেরিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বিপুল অঙ্কের অর্থ কোম্পানির ভেতর থেকে সরানোর ঘটনা দেশের আর্থিক খাতের তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং সংশ্লিষ্ট অডিট সেলের ভূমিকাও এখন আলোচনায়। প্রশ্ন উঠছে—যে প্রতিষ্ঠানে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম চলছিল, সেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ এতদিন কোথায় ছিল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক খাতে এ ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বচ্ছতা, দ্রুত তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
ডিবি এখন নজরুল–খালেক–হেমায়েত সমন্বিত চক্রের আর্থিক লেনদেন, ব্যক্তিগত সম্পদ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং সম্পদের অস্বচ্ছ উৎস নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালাচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া কর্মকর্তাদের জবানবন্দি ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ একত্র করলে দুর্নীতির চক্র আরও পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠবে।
তথ্য বলছে, এই মামলাটি আর্থিক খাতে বড় ধরনের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পরীক্ষাক্ষেত্র হতে পারে।