
নিজস্ব প্রতিবেদক
যৌতুক–নির্যাতনের মামলায় অতীতে কারাভোগ করা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা খায়রুল আলম সুমনকে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরেই নানা প্রশ্ন উঠছে।
তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে স্ত্রীর দায়ের করা যৌতুক মামলায় তিনি ও তার মা আদালতের আদেশে কারাগারে যান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করলে আদালত রিমান্ড ও জামিন—দুটিই নাকচ করে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, সূত্র জানায়, খায়রুল আলম সুমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রবেশনারি অবস্থায় কর্মরত থাকাকালে জেলার তৎকালীন ডিসি ও পরবর্তীতে সচিব আবদুল মান্নানের মেয়েকে বিয়ে করেন।
বিয়ের পর যৌতুক দাবি, শারীরিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার স্ত্রী ওয়ারী থানায় মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, ওয়ারীর বাসায় গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া হয়েছিল এবং সুমন স্ত্রীর হাত চেপে ধরেছিলেন।
এ ঘটনায় দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় মামলাও হয়। ওই বিভাগের মামলার কারণে দীর্ঘ সময় তার নিয়মিত পদোন্নতি আটকে ছিল বলে জানা গেছে।
নতুন ডিসির মন্তব্য, যৌতুক মামলার বিষয়ে মন্তব্য চাইলে ডিসি সুমন বলেন,
“এসব আমার ব্যক্তিগত তথ্য। কর্তৃপক্ষ সব জানে। জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বর্তমানে তার ব্যক্তিগত ডেটা শিটে (পিডিএস) বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
গত বছরের ৩ ডিসেম্বর তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে পদোন্নতির সরকারি আদেশে ‘ভূতাপেক্ষ’ তারিখ দেখানো হয়েছে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পদোন্নতির সময়সীমা পেছনে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। জেলার আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ম্যাজিস্ট্রেসি ও সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন ডিসি।
প্রশাসনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত জীবনে এই মাত্রার বিতর্ক থাকলে তাকে জেলা প্রশাসকের মতো সংবেদনশীল দায়িত্বে দেওয়া স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন তৈরি করে। এটি জেলা প্রশাসনের ইমেজ এবং প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, জেলা প্রশাসকের পদে ব্যক্তিগত জীবনের নৈতিক মানদণ্ডও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—অতীতে আদালতের কঠোর আদেশ, বিভাগীয় মামলা এবং কারাবাসের ইতিহাস থাকলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও সতর্ক হওয়ার কথা।
একজন প্রশাসন বিশেষজ্ঞ বলেন,
এ ধরনের রেকর্ড থাকা কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ জেলার ডিসি করা হলে জনমানসে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। দায়িত্ব পালনের নৈতিক অধিকার এবং প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা—দুটিই আলোচনায় আসে।
বরিশালের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে খায়রুল আলম সুমনের নিয়োগকে ঘিরে এখন প্রশাসনেই তর্ক-বিতর্ক চলছে। অতীতের মামলা, কারাবাস ও বিভাগীয় প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেওয়া—নিয়োগনীতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন রয়ে গেছে—অভিযোগ, তথ্য ও অতীত রেকর্ডের প্রেক্ষাপটে এই নিয়োগের যথার্থতা কতটা নিশ্চিত করেছে সরকার?