
বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা ওয়াসা, রাজধানীর কোটি মানুষের পানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকা সংস্থা, নতুন নেতৃত্ব নিয়োগকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই দাঁড়িয়ে। ১১ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীকে তিন বছরের জন্য ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এবং তথ্য বলছে, এতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট।
বিতর্কিত নিয়োগ ও অনিয়ম
স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ অনুবিভাগ থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, আবদুস সালামকে আগামী তিন বছরের জন্য এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হলো এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে আদেশ কার্যকর হবে। কিন্তু একই দিনে স্থানীয় সরকার বিভাগের পাস-২ শাখা থেকে আরেকটি অফিস আদেশ জারি হয়, যেখানে বলা হয়, উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে এমডি’র রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হলো। ওয়াসার ভেতরের সূত্র জানায়, এই দ্বৈত আদেশই একটি পরিকল্পিত কৌশল ছিল, যার মাধ্যমে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পদে বসানোর পথ তৈরি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার দুই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন,পুরো প্রক্রিয়াই ধাপে ধাপে নিয়ম ভেঙে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো দেখলে বোঝা যায়, এটি একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা।
ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে আবেদন করার বিজ্ঞপ্তি প্রথম প্রকাশিত হয় চলতি বছরের ২১ মার্চ। এতে বলা হয়েছিল, অভিজ্ঞ প্রার্থীদের জন্য বয়সসীমা শিথিলযোগ্য হবে এবং আবেদনকারীর ন্যূনতম গ্রেড তৃতীয় হতে হবে। কিন্তু সেই সময় আবদুস সালাম ছিলেন চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা, অর্থাৎ আবেদন যোগ্য ছিলেন না।
মাত্র তিন দিনের মাথায়, ২৩ মার্চ, ওয়াসা নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে বয়সসীমা শিথিলযোগ্য হওয়ার ধারা বাদ দেওয়া হয়। ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, শর্তের এই পরিবর্তন একমাত্র আবদুস সালামকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আনা হয়েছিল। কারণ, বয়স শিথিলযোগ্য থাকলে অনেক যোগ্য প্রার্থী আবেদন করতেন।
এরপর নিয়োগ প্রক্রিয়া হঠাৎ স্থগিত রাখা হয়। এরই মধ্যে আবদুস সালামকে পদোন্নতি দিয়ে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত করা হয় এবং প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ১৫ জুলাই, যেখানে যোগ্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে সাক্ষাৎকারের জন্য আহ্বান জানানো হবে।
ওয়াসা সূত্র জানায়, এমডি পদে ৩৭ জন আবেদন করেছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন পানিসম্পদ বিষয়ে পিএইচডিধারী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলীসহ অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। কিন্তু তাদের কেউই সাক্ষাৎকারে ডাক পাননি।
এটির পরিবর্তে ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি, সরাসরি তিনজনের নাম চূড়ান্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। তালিকায় আবদুস সালামকে রাখা হয় প্রথমে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানকে দ্বিতীয় স্থানে এবং এলজিইডির সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এনামুল হককে তৃতীয় স্থানে। পরে মন্ত্রণালয় সেই তালিকাই প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠায়।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে চার বছর বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) থাকা আবদুস সালামকে নানা কায়দায় এমডি বানানোর প্রস্তুতি ছিল। এখন সেটিই বাস্তব হয়েছে। যার ইঙ্গিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল
দুর্নীতির অভিযোগ ও প্রভাব
তথ্য বলছে, আবদুস সালামকে এমডি পদে বসানোর জন্য একাধিকবার বিজ্ঞপ্তির শর্ত সংশোধন করা হয়েছে। তার যোগ্যতা নিশ্চিত করতে তাকে পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। এরপর কোনো ধরনের সাক্ষাৎকার ছাড়াই তিনজনের তালিকায় সবার ওপরে রাখার মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে।
এদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদগুলোর নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে ২০০৯ সালে নিয়োগ পাওয়া তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ ছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি আত্মগোপনে যান এবং ১৪ আগস্ট পদত্যাগ করেন। এরপর সংস্থায় স্থায়ী এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই কর্মকর্তা উদয়ের পথকে বলেন, পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর জন্যই পদটিতে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে আবদুস সালামের বিরুদ্ধে বহু দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বিগত সরকারের আমলে তাকে প্রায় চার বছর প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল।
প্রকল্প ও অর্থের গুরুত্ব
সূত্র বলছে রাজধানীতে পানি সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকা ওয়াসায় বর্তমানে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে উন্নয়নকাজ চলছে। এমডি পদে কে বসেছেন এবং প্রকল্প পরিচালক কে নিয়োগ পেয়েছেন, তা সরাসরি প্রকল্পের গতি ও আর্থিক স্বচ্ছতার সঙ্গে যুক্ত।
ওয়াসার একজন কর্মকর্তা জানায়, আব্দুস সালাম দুর্নীতির অভিযোগে সংযুক্ত ছিলেন। এখন কেন তাঁকে এমডি করা হচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়। অন্য একজন বলেন, ওয়াসার ইতিহাসে অভ্যন্তরীণ কাউকে পূর্ণাঙ্গভাবে এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার নজির নেই। তাহলে কী যোগ্যতা নিয়ে আবদুস সালামকে বসানো হলো?
দুর্নীতির ধরন ও অভিযোগের সারসংক্ষেপ, তথ্য বলছে, আবদুস সালাম ও তার সমন্বয়কারী মেসার্স সাজেদা এন্টারপ্রাইজের মালিক আরিফের মাধ্যমে ওয়াসার প্রকল্পগুলোতে নিম্নমানের পণ্য ব্যবহার, ঠিকাদারদের কাছে চাঁদা নেওয়া এবং পদবী ও নিয়োগ বাণিজ্য চালানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, আবদুস সালামের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো অন্তর্ভুক্ত, টাকা দিয়ে পদ অর্জন ২ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ। দরপত্র ও প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদার নিয়োগ, দরপত্র প্রক্রিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ। ওয়াসার প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঘুষ আদায়।
নিম্নমানের সরঞ্জাম আমদানি, ভারত ও চীনের নিম্নমানের মালামাল ব্যবহারের মাধ্যমে রাজধানীর পানি সরবরাহ ঝুঁকিপূর্ণ করা।
ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা প্রয়োগ, নারী সহকর্মীকে বিদেশ সফরের দলে অন্তর্ভুক্ত করা, চাকরি হুমকি ও অপমান।
নিয়োগ ও বদলিতে অর্থ লেনদেন, আউটসোর্সিং নিয়োগে ৫–৭ লাখ টাকার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ।
বদলির আদেশ বাতিল ও পুনঃবদল, ঘুষ ফেরত না দিলে বদলি বাতিল।
বিজ্ঞপ্তি শর্তে পরিবর্তন: বয়সসীমা ও গ্রেডের শর্ত পরিবর্তন করে নিজেকে সুবিধা দেওয়া। বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহার -
অভ্যন্তরীণ ওএসডি সংযুক্তি: চার বছরের বেশি সময় ধরে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে সংযুক্ত থাকা, কার্যত কোনো দায়িত্ব ছাড়া।
ভুক্তভোগী ঠিকাদার আবু সুফিয়ান অভিযোগ করেন, “আমি আড়াই কোটি টাকা দিয়েছিলাম, কিন্তু কাজ দেওয়া হয়নি, বরং ব্ল্যাকলিস্টের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে একাধিকবার লিখিত দিয়েছি , বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ওয়াসার দুর্নীতির শিকড় গভীর। শুধু ব্যক্তি বদলালে হবে না, কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ওয়াসা মূলত রাজনৈতিক নিয়োগের কারণে জবাবদিহিহীন। দুর্নীতির সংস্কৃতি এখন প্রতিষ্ঠানের DNA-তে ঢুকে গেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পরও সংস্থা দুর্নীতিমুক্ত হয়নি।
প্রশ্ন উঠেছে এখন একটাই—ঢাকা ওয়াসার ভবিষ্যৎ কি সেবামুখী প্রশাসনে রূপ নেবে, নাকি থেকে যাবে দুর্নীতির জালে জড়ানো ব্যবসায়িক ঘাঁটি হিসেবে?
তথ্য বলছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসংখ্য অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকার পরও আবদুস সালামকে এমডি পদে বসানো হয়েছে। সংস্থার ভেতরের অবস্থা ভয় ও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ।
উল্লেখ্য, অভিযোগ ও বিতর্ক উপেক্ষা করেই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে এমডি করার এই সিদ্ধান্তে ওয়াসার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।
তথ্য বলছে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুধু একজনকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, বরং সংস্থার সুশাসন ও স্বচ্ছতার ওপর প্রশ্নের ছায়া ফেলা হয়েছে।
আব্দুস সালাম ব্যাপারীর এমডি পদে নিয়োগ ঘিরে রয়েছে বিস্তৃত অভিযোগের ঢেউ—টাকা দিয়ে পদ অর্জন, ঘুষ, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ-দরপত্রে অনিয়ম এবং মামলা প্রত্যাহার। তথ্য বলছে, এতে ওয়াসার প্রশাসন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংস্থার কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না।